[[ বেগম খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক সজীব ওয়াজেদ জয়ের আড়াই হাজার কোটি টাকার বক্তব্য আর কথিত শেখ কামালের ব্যাংক ডাকাতির কল্প কাহিনী সমান্তরাল। ব্যাংক ডাকাতির টাকা আর বঙ্গবন্ধু পরিবারের অর্থ ও ধন-সম্পদের বিবরণী খুজতে বেগম জিয়ার স্বামী জেনারেল জিয়া সহ পাগল ছিলেন খন্দকার মোশতাক, কর্নেল রশিদ, কর্নেল ফারুক, মেজর ডালিম গংরা! সেদিনের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ কি সমান পেয়েছেন ম্যাডাম জিয়া ? সেদিন ওরা কি কি পেয়েছিল মনে আছে ? মনে না থাকলে লেখাটি পড়ে নেবেন ]]
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বঙ্গভবনে তৃতীয় দিন খুনী মোশতাক কেবিনেট মিটিং করে। ওই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয় যে, শেখ মুজিবের অর্থ ও ধন-সম্পদের বিবরণী রেডিও-টিভি এবং পত্রিকায় প্রকাশ করা হবে। বিকেলে সব ব্যাংকের এমডিকে বঙ্গভবনে ডাকা হলো।
কর্নেল রশিদ নিজে দরবার হলে তাঁদের সবাইকে ১৫-২০ জওয়ানের স্টেনগান এবং এসএলআরের সামনে দাঁড় করিয়ে বলল : " মীরজাফর শেখ মুজিবের কোন ব্যাংকে কত টাকা আছে, আপনারা তার বিবরণী নিয়ে এসেছেন? " সব এমডি বললেন যে, তাদের কারও ব্যাংকে ওঁনার কোন একাউন্ট বা টাকা-পয়সা নেই। সোনালী ব্যাংকের এমডি বললেন যে, সোনালী ব্যাংক, ধানমণ্ডি শাখায় ওঁনার ৩৩০০/- (তিন হাজার তিন শ') টাকা আছে। তখন কর্নেল রশিদ স্টেনগান এবং এসএলআর তাক করে রাখা সৈনিকদের চিৎকার করে বললেন : They are bustard, dogs of Sheikh Mujib, fire them (তারা সব জারজ, শেখ মুজিবের কুত্তা, তাদের গুলি করে মেরে ফেলো।) এ কথা শোনা মাত্র এক ব্যাংকের জনৈক এমডি অজ্ঞান হয়ে বঙ্গভবনের দরবার হলের মেঝেতে ধপাস করে পড়ে গেলেন। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তখন আরেক ব্যাংকের এমডি বলে উঠলেন : " স্যার, স্যার, মারবেন না। স্যার, আমার ব্যাংকে একটা আছে? " কর্নেল রশিদ তার কাছে এগিয়ে গিয়ে টাইসহ তার কোটের কলার চেপে ধরে হুঙ্কার দিল, You bustard, now open your mouth. (তুমি জারজ, এখন তোমার মুখ খোল।) তিনি বললেন : " স্যার, আমি হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের এমডি। হাউস বিল্ডিং থেকে উনি (ভয়ে আতঙ্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামটাও উচ্চারণে অপারগ) ৩২ নম্বরের বাড়ি করার জন্য লোন নিয়েছিলেন। সে লোন পরিশোধ করেননি এবং সুদে আসলে তা এখন ৫-৬ লাখ টাকা হবে। এই টাকা ওঁনার কাছে সরকারের পাওনা আছে। " খুনী রশীদ হুকুম দিল : " বাড়ি এক্ষুনি জব্দ করে নিন। " এমডি সাহেব বললেন : " স্যার, নিউজ পেপারে একটা নোটিস দিয়ে দিতে হবে। " খুনী রশিদ বলল : " এক্ষুনি দিয়ে দিন। পত্রিকার লোক কে আছে এখানে? " সবার আগে সেই মার্শাল'লর ধামাধরা ইবলিশ কুদ্দুস ছুটে এল। সে তৎক্ষণাৎ ড্রাফট করে দিল "মৃত শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র মৃত শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির ঋণ বাবদ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের কাছে সুদে আসলে ৫-৬ লাখ টাকা ... বছর যাবত অপরিশোধ্য থাকার প্রেক্ষিতে উক্ত বাড়ি আগামী ৪৫ দিনের পরদিন প্রথম কার্যদিবসে হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন কর্তৃক প্রকাশ্যে নিলামে তোলা হবে। আগ্রহী ক্রেতাগণ ... তারিখে উক্ত বাড়ির সম্মুখে ডাকা প্রকাশ্য নিলামে অংশ গ্রহণ করতে পারেন। নিলামে সর্বোচ্চ দর ডাকার কাছে বাড়িটি বিক্রি করা হবে। খুনী মোশতাকের আরেক ডান হাত খ্যাত তাহের উদ্দীন ঠাকুরের নির্দেশে সেখানে উপস্থিত মর্নিং নিউজের সম্পাদক জনাব শামসুল হুদার হাতে এই নিলামের নোটিস এইচবিএফসির এমডি স্বাক্ষর করে দিয়ে দিলেন। ১ দিন পর ১৯ আগস্ট অথবা ২০ আগস্ট দৈনিক মর্নিং নিউজের পেছনের পাতায় বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ির নিলামের বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়। এই হলো খুনী মোশতাক-রশিদ-ডালিম-ফারুক চক্রের জিঘাংসার শিকার বাংলার মুকুটহীন সম্রাটের অর্থ-বিত্ত ও ধন-সম্পদের সরকারীভাবে প্রকাশিত তথ্য বিবরণী।
১৯৭৫-এর ১৭ আগস্ট কয়েকজন ডিসিকে বঙ্গভবনে ডাকা হলো। সে বিষয়ে আমাকে গত ১৭ আগস্ট (২০১১) সচিব মোকাম্মেল হকের বাসায় এক ইফতার পার্টিতে সে সময়ের (১৯৭৫ সালে) ডিসি জনাব হাসনাত আব্দুল হাই ১৫ আগস্ট প্রসঙ্গে আমাকে বললেন, "সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রায় ১৫ জন ডিসির সঙ্গে আমাকে প্রেসিডেন্ট মোশতাকের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রেসিডেন্ট মোশতাক আমাদের বললেন, 'শেখ মুজিবের ৩২ নম্বরের বাড়িতে ২০ ভরি সোনা পাওয়া গেছে। এগুলো আপনারা অফিসারদের সব জানাবেন। এসব অবৈধ সোনা এবং তাঁর দুর্নীতির প্রমাণ।' মিটিং শেষে আমার সহকর্মীরা সকলে বলাবলি করলেন যে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে মাত্র ২০ ভরি সোনা পাওয়া গেছে, যখন তাঁর দুই পুত্র শেখ জামাল ও শেখ কামালের বিয়ে হয়েছে মাত্র কয় মাস আগেই। এরপর এই ২০ ভরি সোনার গহনার কথা আমাদের অজস্র অফিসারের কাছে তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুর দুর্নীতি প্রমাণের চেষ্টা করা হলে তাদের কাছে ডিসিদের আর কোন মান-সম্মান থাকবে না। আমার সহকর্মীরা প্রায় কোরাশের কণ্ঠে বললেন, খুন-খারাবি করে খুনী মোশতাকের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর চেয়ারে বসার স্বপ্ন সে কি করে দেখে?
[ লেখক :: মুক্তিযুদ্ধা মুসা সাদিক, কলাম লেখক, সাবেক সচিব বাংলাদেশ উইস ফ্রিডমের রচয়িতা ]


No comments:
Post a Comment