গল্লামারী বধ্যভূমি
গল্লামারী বধ্যভূমি খুলনা জেলার অন্তর্গত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এর পাশেই
অবস্থিত । খুলনা শহরের দু'কিলোমিটার অভ্যন্তরে গল্লামারী খালের পাশে এই বধ্যভূমির
অবস্থান। এই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থানেই ছিল রেডিও পাকিস্তানের খুলনা
শাখা। এখানে অনেক মুক্তিকামী
মানুষ ও সাধারণ জনগণকে হত্যা নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। মূলত রাজাকার ও শান্তি কমিটির সহযোগীতায় এসব হত্যাকান্ড হত। এখানে জবাই করে বেশিরভাগ মানুষ মারা হত। প্রথম দিকে শুধুমাত্র রাতের বেলাতে নিরপরাধ মানুষদের হত্যা
করা হলেও শেষের দিকে তারা দিনে রাতে সমানে নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। সারাদিন শহর ও গ্রাম হতে লোকদের ধরে এনে জেলখানা, হ্যালিপোর্ট ও ইউএফডি ক্লাবে জড়ো করা হত, রাত হলে তাদের হাত বেঁধে বেতার কেন্দ্রের সামনে
সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হত। প্রতি রাতে প্রায় শতাধিক মানুষ হত্যা করা হত। এর সাথে আরো ছিল নারী নির্যাতন ও ধর্ষন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর অনেক মুক্তিযোদ্ধা খুলনায় ফিরে
আসেন। সে রকমই একজন
প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুস সাত্তার শিকদারের ভাষ্যমতে,
চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ। খাবার নাই, পানি নাই, ঘর নাই, বাড়ি নাই। মানুষ আর মানুষ। কারো বুক কাটা, কারো গলা কাটা। কোন কোন লাশের পঁচা গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে।
খুলনা শহর মুক্ত হবার পর গল্লামারী খাল ও এর আশেপাশের স্থান থেকে প্রায় পাঁচ
ট্রাক ভর্তি মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গোড় পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় ঐ স্থানে আনুমানিক ১৫০০০ মানুষ হত্যা করা হয়।
সেখানে ১৯৯৫ সালে প্রথম একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়। বর্তমানে সে স্মৃতিস্তম্ভ উন্নয়নের কাজ চলছে।
গোপালপুর গণহত্যা
গোপালপুর গণহত্যা হলো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা সংঘটিত অন্যতম একটি গণহত্যা। এই গণহত্যাটি সংঘটিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৫ মে নাটোর জেলার
লালপুর উপজেলার অন্তর্গত গোপালপুর সদরে। এই গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন উত্তরবঙ্গ চিনিকলে কর্মরত
বাঙালিরা।পশ্চাৎপট
২৫-শে মার্চ, ১৯৭১ এর মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যার মাধ্যমে তৎকালীন
পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি নৃজাতি নির্মূল করার পরিকল্পনা হাতে নেয়, যা অপারেশন সার্চলাইট নামে পরিচিত। এই আক্রমণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায় যা
দীর্ঘ নয় মাস দীর্ঘস্থায়িত হয়েছিল।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ২৫-শে মার্চের রাতেই ঢাকা শহরের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম
করে। কিন্তু তারা দেশের
বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্কল্পবদ্ধ প্রতিরোধের সম্মুখীন
হয়।
পাবনায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২৫তম পদাতিক বাহিনী স্থানীয়দের কাছ থেকে
নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ফলশ্রুতিতে, তারা রাজশাহীর ব্যাটেলিয়ন সদরদফতর থেকে জনবল ও রসদের যোগান চায়। মেজর রাজা আসলাম পাবনা এসে পৌঁছেন, কিন্তু রাজশাহীর দিকে পশ্চাদপসারণ করতে বাধ্য হন। তাদের বিচলন ব্যাহত হয় স্থানীয় বাহিনীর সাথে সংঘর্ষের ফলে। স্থানীয় বাঙালি
বাহিনী অবরোধক স্থাপন করে এবং নাটোরের ধানাইদহে একটি সেতু ধ্বংস করে আক্রমণ
প্রতিহত করতে। গোপালপুর রেলফটকে স্থানীয় স্টেশনকর্তা রেলওয়ে বগিসমূহ দিয়ে অবরোধক তৈরি
করেন।
মার্চের ৩০ তারিখে, পাকিস্তানি
সেনাবাহিনী ওয়ালি ময়না গ্রামের কাছে যাত্রাবিরতি নেয়ার কালে বাঙালি যোদ্ধাদের
একটি দল তাদের আক্রমণ করে স্থানীয় সাঁওতালদের সাহায্য নিয়ে। স্থানীয়দের কাছে ময়নার যুদ্ধ নামে পরিচিত এই সংঘর্ষে
চল্লিশজন বাঙালি যোদ্ধা নিহত হন। যদি-ও পাকিস্তানিদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম ছিল, তদাপি তাদের মনোবলে ছেদ পড়ে।
রাতে পাকিস্তানিরা ছোট ছোট উপদলে বিভক্ত হয়ে পালানোর চেষ্টা করে। পরবর্তী দিন, তাদের অনেকেই স্থানীয় বাঙালিদের হাতে ধরা পড়ে; অন্যতম ছিল নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা মেজর আসলাম। সেনাদের স্থানীয় বাঙালি বাহিনীর নেতা ও উত্তরবঙ্গ চিনিকলের
সাধারণ ব্যবস্থাপক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট আনোয়ারুল আজিম এর বাড়িতে নিয়ে
যাওয়া হয়। সংক্ষিপ্ত বিচারকার্যের পরে লালপুর এসএস পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে পাকিস্তানি
সেনাসদস্যদের গুলি করে মেরে ফেলা হয়। গণহত্যা
বাঙালি প্রতিরোধের উত্তরে, রাজশাহী অবস্থিত
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদরদফতর থেকে স্থলপথে ও আকাশপথে শক্তিদল দ্রুত প্রেরণ করে। সেনাবাহিনী ত্বরিতগতিতে পাবনা, ঈশ্বরদী ও নাটোরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণে সক্ষম হয়। ৫-ই মে, ১৯৭১ তারা
গোপালপুর পৌঁছায় এবং বাঙালিদের শক্ত ঘাঁটি চিনিকল দখল করে ফেলে। প্রায় ২০০ বাঙালি জনগণ যারা মূলত চিনিকলের কর্মচারী ছিল, সবাইকে জড়ো করা হয় ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে
জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যোদ্ধাদের নেতা অবসরপ্রাপ্ত লে. আনোয়ারুল আজিম সেনাবাহিনীর হাতে ধরা দেন এবং
অনুরোধ করেন যেন নিরীহ লোকজনকে ছেড়ে দেয়া হয়। সেনারা লে. আজিম ও তার পরিবারকে গুলি করে। বন্দী কর্মচারীদের চিনিকলের ভিতরে একটি পুকুরের সামনে লাইনে
দাঁড় করানো হয় এবং গুলি করে মারা হয়। গুলিবিদ্ধ ২০০ জন বন্ধীর মাঝে মাত্র চারজন- আবদুল জলিল
শিকদার, খরশেদ আলম, আবুল হোসেইন, ইমাদ উদ্দিন এবং ইঞ্জিল সর্দার বাঁচতে সক্ষম হন।
মৃতদেহগুলোকে পুকুরে নিক্ষেপ করা হয়। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পুকুরটির নামকরণ করা হয় 'শহীদসাগর।' গোপালপুর রেলওয়ে স্টেশনের নাম পরিবর্তন করা হয় 'আজিমনগর স্টেশন,' অবসরপ্রাপ্ত লে. আজিমের স্মরণে।
১৫ ডিসেম্বর, ২০০৯ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলোর "বধ্যভূমি থেকে
ফেরা তাঁরা চারজন" শীর্ষক রিপোর্টে প্রত্যক্ষদর্শী খন্দকার জালাল আহমেদের
ভাষ্যে,
"১৯৭১ সালের ৫ মে সকাল সাড়ে ১০টায় দায়িত্ব পালন করছিলাম। দুজন পাকিস্তানি সেনা আমার দুই পাশে এসে দাঁড়াল। একজন পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে বলল, ‘ইয়ে বাঙালি, মিটিং মে চল’। এ সময় মাথায় সাদা রুমাল বাঁধা মঞ্জুর ইমান নামের একজন
অবাঙালি কর্মচারী বাঙালিদের শনাক্ত করে দিচ্ছিল। এর মধ্যে মিলের কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট
আনোয়ারুল আজিমকেও ধরে আনা হয়। একজন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা আজিমকে বলে, ‘কিসনে মেজর আসলামকে মারা হায়’? তিনি বলেন, জানি না। আজিম এ সময় হানাদারদের সঙ্গে তর্ক শুরু করেন। পরে নরপশুরা আমাদের মিলের অফিসার্স কোয়ার্টারের পুকুরঘাটে
নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘাতকদের ১৩টি স্বয়ংক্রিয় এলএমজি
একসঙ্গে আমাদের ওপর গর্জে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে পুকুরঘাট লাশের স্তূপে পরিণত হয়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মিলে কর্মরত প্রায় ২০০ শ্রমিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। মৃত্যু নিশ্চিত করতে আমাদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে পানির
মধ্যে গড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনারা। একসময় জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখি, আমার মাথাটা ঘাটের ওপর এবং দেহের অর্ধেক অংশ পানির মধ্যে
ডুবে আছে। লাশের স্তূপের মধ্যে উল্টে-পাল্টে জীবন্ত কাউকে খুঁজছিলেন আমার সহকর্মী মেহমান
আলী। বুঝলাম, তিনিই আমাকে লাশের স্তূপ থেকে উদ্ধার করেছেন। বহু কষ্টে উঠে বসতেই দেখতে পেলাম, পাশে পড়ে আছে ছোট ভাই মান্নানের লাশ। হত্যার আগে ও আমাকে পালিয়ে যেতে বলেছিল।”
এ রিপোর্টে আরো বলা হয়,
"জালাল আহমেদ জানান, ব্রাশফায়ারের আগ মুহূর্তে মান্নান নামের মিলের এক হিসাব সহকারী শায়িত
অবস্থায় মাথাটা সামান্য উঁচু করে পবিত্র কোরআন পাঠ করছিলেন। তাঁকে দেখে হানাদারেরা বলে, ‘তুম মৌলবি হু? ছোড় দাও।’ তখন তিনি বলেন, ‘আমি একা যাব না। সবাইকে ছাড়।’ হানাদারেরা তখন মান্নানকে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত্যা করে। মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পুকুরে অর্ধেক ডুবন্ত অবস্থায়
কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। পরে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে।"
জিঞ্জিরা গণহত্যা
জিঞ্জিরা গণহত্যা একটি পরিকল্পিত সামরিক গণহত্যা যা
পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সময়ে সংঘটিত করে। ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল শুক্রবার ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত,
বুড়িগঙ্গা
নদীর অপর পাড়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলার জিঞ্জিরা,কালিন্দি ও
শুভাড্যা এই তিন ইউনিয়নব্যপী এই গণহত্যাটি সংঘটিত হয়।
হত্যাকান্ডের বিবরণ
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময়ে ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটএর
পুর্বপরিকল্পিত গণহত্যার পর ঢাকা শহরের বেঁচে যাওয়া মানুষজন পালানোর স্থান ও
প্রথম নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে বুড়িগঙ্গা নদীর অপর পাড়ে অবস্থিত জিঞ্জিরার দিকে
যাত্রা করে। জিঞ্জিরা ও এর
আশেপাশের এলাকাগুলো ছিল তখন প্রধানত হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। তাই সেগুলো আগে থেকেই পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক চিহ্নিত ছিল। যখন ঢাকা থেকে পালিয়ে সবাই সেখানে জড় হতে থাকে, তখন পাকিস্তানী
হানাদার বাহিনী সেখানে গণহত্যা চালানোর প্রস্তুতি নেয়।তারা ১ এপ্রিল মধ্যরাতের পর থেকে অর্থাৎ ২ এপ্রিল ভোর থেকে জিঞ্জিরায় সৈন্য
সমাবেশ করতে থাকে এবং কেরানীগঞ্জকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে।
পাকিস্তানীরা ঐদিন গভীর রাতেই বুড়িগঙ্গার অন্য পাড়ের
মিটফোর্ড হাসপাতাল দখল করে নেয় এবং হাসপাতাল সংলগ্ন মসজিদের ছাদ থেকে আনুমানিক ৫টায়
ফ্লেয়ার ছুড়ে গণহত্যা শুরু করার জন্য সংকেত প্রদান করে।প্রায় আনুমানিক ভোর সাড়ে ৫ টা থেকে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে একটানা নয় ঘণ্টা
চালিয়ে যায় এবং দুপুর ২.৩০ এ হত্যাযজ্ঞ শেষ করে। তারা ঘরবাড়িতে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। মান্দাইল ডাকের সড়কের সামনের পুকুরের পাড়ে পাকিস্তানী
বাহিনী ষাট জন লোককে একসাথে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে।এ গণহত্যায় আনুমানিক এক হাজার বা তার চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ মৃত্যুবরণ করে।
পাকিস্তানী প্রচারযন্ত্রের মিথ্যা সংবাদ প্রচার
জিঞ্জিরা গণহত্যার পরের দিন, অর্থাৎ ৩ এপ্রিল ১৯৭১
পাকিস্তানী প্রচারযন্ত্র জিঞ্জিরা গণহত্যাকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য এবং দেশের
অন্যান্য মানুষ ও বহির্বিশ্বকে বিভ্রান্ত করার জন্য হত্যার সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন
করে মিথ্যা খবর প্রচার করে। ৩ এপ্রিল তৎকালীন
পাকিস্তান সরকার সমর্থিত পত্রিকা মর্নিং নিউজের একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল এরকম,"Action
against miscreants at Jinjira" অর্থাৎ "জিঞ্জিরায় দুস্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
গ্রহন"।
আর তৎকালীন পিটিভি (পাকিস্তান টেলিভিশন) ঐ দিন ২ এপ্রিল
রাতে খবর প্রচার করে, " বুড়িগঙ্গা নদীর অপর পাড়ে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় আশ্রয়
গ্রহণকারী বিচ্ছিন্নতাবাদী দুস্কৃতিকারীদের কঠোর হাতে নির্মূল করা হয়েছে"।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত
হয়ে থাকে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তীকালীন সকল আন্দোলনের
সূতিকাগার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে তদানীন্তন পাকিস্তান সামরিক বাহিনী প্রধান ইয়াহিয়া খান এবং রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টো বাঙ্গালীর স্বাধীনতার দাবী দমন করার প্রয়াসে "অপারেশন
সার্চলাইট" নামে গণহত্যার পরিকল্পনা করে, যা ২৫ মার্চ রাতে
বাস্তবায়ন করা হয়।
২৫ মার্চের কালোরাত
(শহীদদের স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি স্মৃতিসৌধ)
অস্ত্রসম্ভারের মাঝে ছিলো ট্যাংক, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, রকেট নিক্ষেপক, ভারী মর্টার, হালকা মেশিনগান ইত্যাদি। এই সমস্ত অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাকিস্থানী বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে অগ্রসর হয়। ইউনিট নং ৪১ পূর্ব দিক থেকে, ইউনিট নং ৮৮ দক্ষিণ দিক থেকে এবং ইউনিট নং ২৬ উত্তর দিকে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘিরে ফেলে।শিক্ষক হত্যাকাণ্ড
২৫ মার্চের গণহত্যার (অপারেশন
সার্চলাইট) প্রথম পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষককে হত্যা করা হয়। অধ্যাপক
ফজলুর রহমান এবং তার দুই আত্মীয় নীলক্ষেতের ২৩ নং ভবনে নিহত হন। তাঁর স্ত্রী দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে বেঁচে যান। পাকবাহিনী অধ্যাপক আনোয়ার পাশা এবং অধ্যাপক
রশিদুল হাসানের (ইংরেজি বিভাগ) বাসভবন আক্রমণ করে। তাঁরা দুজনেই খাটের নিচে লুকিয়ে বেঁচে যান, কিন্তু
পরবর্তীতে আল-বদর বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান। ২৪ নং
ভবনে বাংলা সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম থাকতেন। তাঁর বাসভবনে প্রবেশমুখে দুইজন আহত নারী তাদের সন্তানসহ
কিছুক্ষণের জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের রক্তের দাগ লেগে ছিলো মাটিতে। পাকবাহিনী যখন তাঁর বাসভবন আক্রমণের
জন্য আসে, তখন তারা রক্তের দাগ দেখে ধারণা করে নেয় অন্য কোন ইউনিট
হয়তো এখানে কাজ সমাধা করে গেছে, তাই তারা আর প্রবেশ করেনি। এভাবে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম নিতান্ত ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। পরবর্তীকালে তিনি জানান যে, ওই ভবনে
আরও একজন পূর্ব-পাকিস্থানী অধ্যাপক বাস করতেন,
যিনি ২৫
মার্চের আগেই ঘর ছেড়ে যান। অন্যসব বাসায় অবাঙ্গালী কিছু পরিবার থাকতো, যারা
অন্যদের কিছু না জানিয়েই ঘর ছেড়ে অন্যত্র সরে যায়।
১২ নং ফুলার রোডের
বাসভবনে পাকিস্থানী আর্মি সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সায়েদ
আলী নোকির বাসায় যায়। আর্মি
তাকে ছেড়ে দিলেও ওই একই ভবনের ভূ-তত্ত্ববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল মুক্তাদিরকে হত্যা
করে। তাঁর মৃতদেহ
জহরুল হক হলে (তদানীন্তন ইকবাল হল) পাওয়া যায়। পরে তাঁর আত্মীয়েরা তাঁকে পল্টনে সমাহিত করেন। ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ক ম মুনিম, যিনি সেই
সময় সলিমুল্লাহ হলের হাউস টিউটরের দায়িত্বে ছিলেন, পাকিস্থানী বাহিনীর আক্রমনে
আহত হন। ঢাকা হলের
গণিত বিভাগের অধ্যাপক আ র খান খাদিম ও শরাফত আলীকে হত্যা করা হয়। পাকিস্থানী বাহিনী জগন্নাথ হলে শিক্ষকনিবাসে
আক্রমণ করে এবং অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মির্জা হুদা ও ইতিহাস
বিভাগের অধ্যাপক মফিজুল্লাহ কবিরকে লাঞ্ছিত করে।
তৎকালীন সময়ে হিন্দু
ধর্মাবলম্বী ছাত্রদের আবাস জগন্নাথ হল আক্রমণের সময় হলের
প্রভোস্টের বাসাও আক্রমণ করা হয়। পাকিস্থানী বাহিনী ভূতপূর্ব-প্রভোস্ট এবং
জনপ্রিয় শিক্ষক, দর্শণ শাস্ত্রের অধ্যাপক জি সি দেবকে
হত্যা করে, সংগে তাঁর মুসলিম দত্তক কন্যার স্বামীকেও। এর পর পাকিস্থানী বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী বাসভবনে আক্রমণ
করে এবং সেখানে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড মনিরুজ্জামানকে তাঁর পুত্র ও
আত্মীয়সহ হত্যা করে। জগন্নাথ হলে প্রভোস্ট অধ্যাপক জ্যোতির্ময়
গুহঠাকুরতা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে মারাত্মকভাবে আহত হন এবং পরে
হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। হলের
ইলেক্ট্রিসিয়ান চিত্রাবলী ও চাক্ষুস সাক্ষী রাজকুমারী দেবী জানান, ঢাকা
মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকেরা অধ্যাপক ঠাকুরতাকে চিনতে পারেন এবং তাঁকে ঢাকা
মেডিকেল কলেজের মর্গের কাছে একটি গাছের নিচে সমাহিত করেন।
জ্যোতির্ময় গুহ
ঠাকুরতার সাথে অধ্যাপক মনিরুজ্জামানকেও রাখা হয় এবং পরে হত্যা করা হয়। সহযোগী হাউস টিউটর অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকেও
ছাত্রাবাসেই হত্যা করা হয়। অধ্যাপক
আনোয়ার পাশার উপন্যাস "রাইফেল, রোটি, অওরাত" থেকে এ তথ্য জানা যায়। অধ্যাপক পাশা পরবর্তীতে ডিসেম্বর মাসে আল-বদর বাহিনীর হাতে
নিহত হন। তিনি তাঁর এই জনপ্রিয় উপন্যাসটি ১৯৭১ এর যুদ্ধকালীন ৯ মাসে
রচনা করেন।
ছাত্রহত্যা
অসহযোগ আন্দোলন মূলত
গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহরুল হক হলের "স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন পরিষদ"কে কেন্দ্র করে। তাই, পাকবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম লক্ষ্য ছিলো এই হলটি। অধ্যাপক ড. ক ম মুনিমের মতে, এই হলের
কম-বেশি ২০০ জন ছাত্রকে পাকবাহিনী হত্যা করে।
রাত বারোটার পর
পাকসেনারা জগন্নাথ হলে প্রবেশ করে এবং প্রথমে মর্টার আক্রমণ
চালায়, সেই সাথে চলতে থাকে অবিরাম গুলি। তারা উত্তর ও দক্ষিণের গেট দিয়ে
ঢুকে নির্বিচারে ছাত্রদের হত্যা করতে থাকে। সেই আঘাতে ৩৪ জন ছাত্র প্রাণ
হারান। জগন্নাথ
হলের কয়েকজন ছাত্র রমনা কালী বাড়ির বাসিন্দা ছিলেন। সেখানে ৫/৬
জনকে হত্যা করা হয়। তাদের
মধ্যে কেবলমাত্র একজনের নাম পরবর্তীতে জানতে পারা যায়, তার নাম রমণীমোহন
ভট্টাচার্য্য। ছাত্রদের
কাছে আসা অনেক অতিথিও এই সময় প্রাণ হারান। এদের মধ্যে ভৈরব কলেজের হেলাল, বাজিতপুর
কলেজের বাবুল পল, জগন্নাথ হলের বদরুদ্দোজা, নেত্রকোনার জীবন সরকার, মোস্তাক, বাচ্চু ও
অমর। আর্চার কে ব্লাড-এর বই "The Cruel birth of Bangladesh" হতে জানা যায় যে, ছাত্রীনিবাস রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় এবং ছাত্রীরা
আগুন থেকে বাঁচতে হলের বাইরে আসা শুরু করলে পাকবাহিনী তাদের উপরে
নির্বিচারে গুলি চালায়। পাকবাহিনী নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সাথে আর্মি ইউনিট ৮৮ এর
কথোপকথন থেকে জানা যায়, আনুমানিক ৩০০ জন ছাত্রীকে সেসময় হত্যা করা হয়।কর্মকর্তা-কর্মচারী হত্যা
জহরুল হক হল আক্রমণের
প্রথম পর্যায়েই ব্রিটিশ কাউন্সিলে পাহারারত ইপিআর গার্ডদের
হত্যা করা হয়। তারপর
হলের কর্মচারী সিরাজুল হক, আলী হোসেন, সোহরাব আলী গাজী ও আব্দুল মজিদকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
লাউঞ্জে হত্যা করা হয়। রোকেয়া হল চত্বরে সপরিবারে হত্যা করা হয় আহমেদ আলী, আব্দুল
খালেক, নমি, মোঃ সোলায়মান খান, মোঃ নুরুল ইসলাম, মোঃ হাফিজুদ্দিন ও মোঃ চুন্নু মিয়াকে।
শহীদ মিনার ও বাংলা
অ্যাকাডেমী আক্রমণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাদলটি শহীদুল্লাহ
হল সংলগ্ন শিক্ষকনিবাসগুলোয় এবং মধুসূদন দে'র বাসভবনেও আক্রমণ করে। ১১ নং ভবনে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরী বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ
সাদেককে হত্যা করা হয়। এখানে পাকবাহিনী প্রায় ৫০টির মতো হত্যাকাণ্ড ঘটায়, যাদের মধ্যে
কয়েকজন পুলিশ অফিসার (রাজারবাগ পুলিশ লাইনে থেকে পালিয়ে আসা), রাষ্ট্রপতি
ভবনের পাহারার দায়িত্বে থাকা ইপিআর সদস্যগণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ২৩ নং
আবাসিক ভবনের ছাদে আশ্রয় নেয়া নীলক্ষেত বস্তির কয়েকজন অধিবাসী।
মার্চের ২৫ থেকে ২৭ তারিখের
মধ্যে পাকিস্থান সেনাবাহিনী ভিন্ন ধর্মালম্বীদের তিনটি উপাসনালয় ধ্বংস করে ফেলে - কলা ভবন
সংলগ্ন গুরুদুয়ারা নানক শাহী,
রমনা কালী মন্দির ও শহীদ মিনার সংলগ্ন রমনা শিব মন্দির। রাতে দর্শণ বিভাগের কর্মচারী খগেন দে, তার ছেলে
মতিলাল দে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী সুশীল চন্দ্র দে, বোধিরাম, ডাক্কুরাম, ভিমরায়, মণিরাম, জহরলাল
রাজবর, মনবরণ রায়, রাজবর ও সংকর কুরীকে হত্যা করা হয়।
ছাত্রী-নিবাস আক্রমণ
ঢাকার তৎকালীন
কাউন্সিল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড তার বই 'The
cruel birth of Bangladesh' এ লিখেছেন
- "ছাত্রীনিবাস রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় এবং
ছাত্রীরা আগুন থেকে বাঁচতে হলের বাইরে আসা শুরু করলে পাকবাহিনী তাদের
উপরে নির্বিচারে গুলি চালায়। এছাড়া, ১০ নভেম্বর ১৯৭১ এ কয়েকজন সশস্ত্র
দুস্কৃতিকারী রোকেয়া হল আক্রমণ করে এবং ৩০ জনের মতো ছাত্রীকে প্রায়
দুই ঘণ্টার মতো অবরুদ্ধ করে রাখে। তারা প্রভোস্টের বাড়িও আক্রমণ করে"। ১৯৭১ এর সেই সময়ে রোকেয়া হলের কাছেই দু'টি
শক্তিশালী সেনা ঘাটি ছিলো, তাদের অজ্ঞাতসারে ছাত্রীনিবাসে দুই ঘণ্টা ধরে এই আক্রমণ
চালানো একেবারেই অসম্ভব ছিলো । তাই ধরে নেয়া যায় যে,
এটা তাদেরই কারো অথবা তাদের সুবিধাভোগী বিহারীদের
কাজ ছিলো।
যুদ্ধকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-কার্যক্রম
তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্থানের গভর্ণর টিক্কা খান আদেশ জারী করেন, ২১শে এপ্রিল থেকে বিভাগীয় প্রধানদের এবং ১লা জুন থেকে বাকি শিক্ষকদের
কাজে যোগদান করতে হবে। তার আদেশ অনুযায়ী, আগস্টের ২ তারিখ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে শিক্ষার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখানোর জন্য সব ছাত্রাবাস থেকে সব ধরনের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করে ফেলা হয়। জাতীয় দুর্যোগের কারণে সকল পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এই সময় ক্লাসে ছাত্র উপস্থিতি ছিলো নগণ্য। কিন্তু সেপ্টেম্বর নাগাদ যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে ক্লাসে ছাত্রদের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলো, তারা খুব দ্রুত গ্রেনেড ফাটিয়ে আবার ক্লাসে ঢুকে যেত। যে কারণে পাকবাহিনী কাউকেই গ্রেফতার করতে পারে নি।
শিক্ষকদের হুমকি, গ্রেফতার এবং শাস্তি
মুক্তিবাহিনীর সাথে প্রমাণিত যোগাযোগের কারণে টিক্কা খান বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করে এবং কয়েকজনকে গ্রেফতারও করে। এদের মধ্যে ছিলেন ড আব্দুল খায়ের, ড রফিকুল ইসলাম, ড ক আ ম সালাউদ্দিন, আহসানুল হক, গিয়াসুদ্দিন আহমেদ,
জহরুল হক ও ম শহীদুল্লাহ। মার্শাল ল জারীকারী গভর্নর লেফটেনেন্ট জেনারেল টিক্কা খান দাপ্তরিকভাবে অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম, অধ্যাপক সিরাজুল
ইসলাম চৌধুরী এবং অধ্যাপক এনামুল হককে সতর্ক করে। ড আবু মুহাম্মাদ হাবিবুল্লাহ চাকরী হারান। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ততার দায়ে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে (রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক সম্মানভূষিত) ১৪ বছর জেলের সাজা দেয়া হয়।
১৯৭১ এ যুদ্ধকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য
১৯৭১ এ যুদ্ধকালীন
সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ খালি রাখা হয়েছিলো। মার্চের গোড়ার দিকে তৎকালীন উপাচার্য বিচারপতি আবু সাইয়িদ চৌধুরী
জেনেভায় অবস্থান করছিলেন "United
Nation’s Humanitarian Conference" এ
অংশগ্রহণের জন্য। মার্চের
মাঝামাঝি সময়ে তিনি পত্রিকা মারফত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রের মৃত্যুর কথা
জানতে পারেন। তিনি তৎক্ষনাৎ
প্রাদেশিক শিক্ষাসচিবের কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন এবং জেনেভা
থেকে পালিয়ে লন্ডনে আত্মগোপন করেন। সেখানে থেকে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের
জন্য কাজ করে যান। স্বাধীন
বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি পরবর্তীকালে দায়িত্ব পালন করেন।
পাকিস্থান সেনাবাহিনী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড সাইয়িদ
সাজ্জাদ হুসেইনকে তুলে আনে এবং তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য
হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষকদের মধ্যে যারা পাকিস্থান সরকারকে সহযোগিতা করেছিলেন, তাদের
মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ড হাসান জামান, ড মোহর আলী, ড আ ক ম আব্দুর রহমান,
ড আব্দুল বারী,
ড মুকবুল হোসেন,
ড সাইফুদ্দিন জোয়ার্দার প্রমূখ। রাজাকার এবং উপাধ্যক্ষ ড সাইয়িদ সাজ্জাদ হুসেইন, ড হাসান
জামান এবং ড মোহর আলীকে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর গ্রেফতার করা হয়
এবং নির্বাসনে পাঠানো হয়।
১৪ই ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবি হত্যা
১৯৭১ এর ডিসেম্বর মাসে পাকিস্থান সরকারের কাছে পরিষ্কার হতে থাকে যে তারা
যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে। ২রা জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুনরায় খোলার পর, পাকিস্থানী দোসর শিক্ষকেরা নওয়াব আব্দুল গণি রোডে মিলিত হন
এবং একটি তালিকা তৈরি করেন, যাতে বাংলাদেশের
মুক্তিসংগ্রামের সাথে জড়িত শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবিদের নাম তালিকাবদ্ধ করা হয়। এর আগে, পাকিস্থানী
সেনাবাহিনী মাদ্রাসা,
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া
পাকিস্থানপন্থী কিছু ছাত্রদের দল গড়ে গোপনে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়। এদের নাম দেয়া হয় আল-বদর। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এই আল-বদর দলের সদস্যরা মাঠে
নামে। তারা তালিকা
অনুসারে বাঙ্গালী অধ্যাপক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং আরো অনেক মেধাবী বুদ্ধিজীবিদের বেছে বেছে
হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
No comments:
Post a Comment