JANUARY TO DECEMBER-1971


• চট্টগ্রাম শিল্প এবং বণিক সমিতি এবং ঢাকা শিল্প ও বণিক সমিতি গত ৩১ ডিসেম্বর ঘোষিত নয়া আমদানী নীতির কঠোর সমালোচনা করেছে। ঢাকা শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, নয়া আমদানী নীতিতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে। তিনি বলেন, বাণিজ্যমন্ত্রী পূর্ব পাকিস্তানের কোন অর্থনৈতিক সমস্যার কথাও উল্লেখ করেন নি। যদিও পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমস্যা বিশ্বদৃষ্টি আকৃষ্ট করেছে। আর এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি, যেমন ফ্রিলিষ্ট ও বোনাস ভাউচারের বিলোপ সরকারের নজরে পড়েনি। এসব দাবি-দাওয়া পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্যিক সম্প্রদায় তাদের বাণিজ্যিক সংগঠনের মাধ্যমে পাঁচ বছর যাবৎ বারবার উত্থাপন করে আসছে।
                                   • পাকিস্তানের পিপল্স পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো করাচীতে জানান যে, তিনি তার প্রস্তাবিত ঢাকা সফর সাময়িকভাবে বাতিল করে দিয়েছেন। পাকিস্তান আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ৩ জানুয়ারি তার ঢাকা সফর করার কথা ছিল। ক্লিফটনস্থ স্বীয় বাসভবনে অনুষ্ঠিত এক ঘরোয়া বৈঠকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য পশ্চিম পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ৬টি নির্বাচনী এলাকায় তাকে সময় দিতে হচ্ছে বলে উক্ত সফর পরিকল্পনা সাময়িকভাবে বাতিল করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তিনি তার পরিবর্তে পাঞ্জাব পিপলস পার্টির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা খারকে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য ঢাকা পাঠাতে চেয়েছেন। এ ব্যাপারে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তিনি টেলিফোনে যোগাযোগ করতেও ব্যর্থ হন। ফলে জনাব খারকে তার বিমানের টিকিট বাতিল করে দিতে হয় বলে তিনি জানান।
                                 • বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কাশ্মীরীদের পূর্ণ সমর্থনদানের আশ্বাস দেন। খাজা সানাউল্লাহ শামিমের নেতৃত্বে কাশ্মীর মুসলিম সম্মেলনের পাঁচজন নেতা আজ বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি তাঁদের উপরোক্ত আশ্বাস দেন। কাশ্মীরী নেতৃবৃন্দ সাম্প্রতিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য আজাদ কাশ্মীরের প্রেসিডেন্ট সরদার আবদুল কাইয়ুমের একটি অভিনন্দনবাণী বঙ্গবন্ধুর নিকট পৌঁছে দেন। এছাড়া পশ্চিম পাকিস্তান হতে বেশ কিছু সংখ্যক নব-নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য ও পশ্চিম পাকিস্তানি আওয়ামী লীগ নেতা গতকাল বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এসব নেতা ৩ জানুয়ারি রমনা রেসকোর্সে আওয়ামী লীগের শপথ দিবসের সমাবেশে যোগদানের উদ্দেশ্যে ঢাকা পৌঁছেছেন।
                                   • পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউটে প্যালেস্টাইন বিপ্লব শুরুর ষষ্ঠ বার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে বলেন যে, ন্যায়, সত্য ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জন্মভূমি পুনরুদ্ধারের মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত প্যালেস্টাইন মুক্তি সংস্থা আল-ফাতাহর জয় হবেই। কারণ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামের বিজয় অনিবার্য।
অনুষ্ঠানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, পূর্ব পাকিস্তানে নিযুক্ত আল ফাতাহর প্রতিনিধি আবু মুনির এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী বদরুন্নেসা আহমেদ বক্তব্য রাখেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন তাঁর সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সফর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন এবং বলেন প্যালেস্টাইনী কমান্ডোরা দেশপ্রেমেরই প্রতিমূর্তি।
                                   • পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যকরী পরিষদের সভা করাচী ও রাওয়ালপিন্ডি সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে দৈনিক পাকিস্তান অবজারভারের রাওয়ালপিন্ডিস্থ প্রতিনিধি সৈয়দ নজিউল্লাহ এবং ‘ইন্টার উইং’- এর সম্পাদক এ.আর. শামসুদ্দোহাকে মুক্তিদানের আহবান জানান। সভায় সমালোচনা করা হয় যে, যে সময় দেশে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের সুযোগ করা হয়েছে সে সময় কোন সাংবাদিককে তাঁর নিজস্ব মতামত প্রকাশের জন্য শাস্তি দেয়া উচিত নয়।

 
2ND JANUARY

• ভুট্টোর দূত, গোলাম মোস্তফা খার ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের মধ্যে আজ অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, আগামী ১৭ জানুয়ারির পর আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ও পিপলস পার্টি প্রধান জেড. এ. ভুট্টো শাসনতান্ত্রিক প্রশ্ন আলোচনার জন্য ঢাকায় বৈঠকে মিলিত হবেন। গোলাম মোস্তফা খার বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তাঁর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করেন এবং তাঁরা উভয়েই শাসনতন্ত্র রচনা সম্পর্কে দুই দলের সহযোগিতার ব্যাপারে আলোচনা করেন। জনাব খার আজ লাহোরের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন।
                                    • ঘূর্ণিদুর্গত এলাকায় সাহায্য কাজের অগ্রগতি বিবেচনার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সভাপতিত্বে এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের চীফ সেক্রেটারি, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন চেয়ারম্যান, পিএডিসি’র চেয়ারম্যান, অর্থ দফতরের সেক্রেটারি, কৃষি দফতরের সেক্রেটারি এবং রিলিফ কমিশনার উক্ত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, দুর্গত লোকজনকে যথাশীঘ্র সম্ভব আত্ম-নির্ভরশীল করে তোলার উদ্দেশ্যে টেস্ট রিলিফ ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। দুর্গত এলাকায় কৃষকদের কৃষিঋণ ও বীজ প্রদান এবং চাষ কাজে ট্রাক্টর সরবরাহ করার জন্যও উক্ত বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
                                   • ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান সংবাদপত্র সমিতির আঞ্চলিক কমিটির জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস কর্তৃপক্ষ কর্তৃক একতরফাভাবে নিউজপ্রিন্টের মূল্যবৃদ্ধিতে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। প্রতিটনে ৩২৫ টাকা করে নিউজপ্রিন্টের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতিটন ১৫৪০ টাকা বর্ধিত হারে নতুন করে লেটার অব ক্রেডিট খোলার অনুরোধ জানিয়ে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলসের প্রেরিত পত্র নিয়ে বৈঠকে আলোচনা করা হয়। বৈঠকে ১৯৭০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান সংবাদপত্র সিমিতির কার্যকরী কমিটির জরুরি সভায় এক প্রস্তাব এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সাথে সংবাদপত্র শিল্পের প্রতিনিধিদের আলোচনার কথা স্মরণ করা হয়। সেই আলোচনা শেষে প্রাদেশিক সরকার কর্তৃক এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিলো যে, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল কর্তৃপক্ষের নিউজপ্রিন্টের মূল্যবৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে না। সরকার সংবাদপত্র শিল্পকে আশ্বাস দান করেছিল যে, এই বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত প্রতিনিধিদের সাথে যথাযথ আলোচনার পরই করা হবে।

3RD JANUARY

* ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ সমাবেশে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নবনিবার্চিত আওয়ামী লীগ দলীয় ৪১৯ জন সদস্য শপথ গ্রহণ করেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সমাবেশে তাঁর নীতি নির্ধারণী বক্তব্য দান করেন। সমাবেশে নব নির্বাচিত পরিষদ সদস্যগণ দেশে শোষণ, অবিচার ও বৈষম্যমুক্ত এক নয়া সমাজ গড়ার জন্য ১১ দফা ও ৬ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের শপথ গ্রহণ করেন। শপথ গহণ শেষে ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছাসে নিহতদের আত্মার মাগফেরাত এবং ৭ কোটি বাঙালির ঐক্য কামনা করে এক বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে উপস্থিত হাজার হাজার জনতার সামনে নির্বাচিত গণপ্রতিধিরা শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন।
                                  * আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান রমান রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় বক্তৃতাকালে সাবধান করে বলেন, ষড়যন্ত্র এখনও চলছে। জনতাকে উদ্দেশ্য করে বঙ্গবন্ধু বলেন, চরম ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্ত্তত থাকবেন। তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ঘোষণা করেন যে, ৬-দফার শাসনতন্ত্র প্রণীত হবেই, কেউ এটা ঠেকাতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রদত্ত নীতি নির্ধারণী বক্তৃতায় শাসনতন্ত্র প্রণয়নের প্রশ্নে ঘোষণা করেন যে, সংখ্যায় বেশি আছি বলে একথা বলবো না যে, কারো সহযোগিতা চাই না। আমরা সহযোগিতা চাই, তবে নীতির প্রশ্নে কোন আপোষ নেই। তিনি বলেন, ৬ দফা ও ১১ দফা আওয়ামী লীগ বা মুজিবের সম্পত্তি না, জনতার সম্পত্তি। একে রদবদল করার অধিকার সদস্যদের নেই।
বক্তৃতাকালে বঙ্গবন্ধু সাজাপ্রাপ্ত ও বিনাবিচারে আটক সকল রাজনৈতিক নেতা কর্মী ছাত্র ও শ্রমিকদের মুক্তি ও সাজা মওকুফের দাবি জানান। তিনি উত্তরবঙ্গবাসীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, যমুনার উপর নিশ্চয় সেতু হবে, টাকার অভাব হবে না। শীতলক্ষ্যা ও মেঘনার উপরও সেতু নির্মাণের প্রচেষ্টা চালানো হবে। তবে আস্তে আস্তে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে কাশ্মীর ও ফারাক্কা বিরোধের শান্তিপূর্ণ মীমাংসার প্রচেষ্টা চালাবেন বলে তিনি ঘোষণা করেন।
                                  * মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী তানশ্রী সার্দস তিন দিনব্যাপী পূর্ব পাকিস্তান সফর শেষে সন্ধ্যায় স্বাদেশের পথে ঢাকা থেকে ব্যাঙ্কক যাত্রা করেন। ঢাকা বিানবন্দরে মালয়েশীয় মন্ত্রীকে পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. মালিক এবং ঢাকাস্থ ইন্দোনেশীয় ভাইস কন্সাল বিদায় সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করেন। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানকালে মালয়েশীয় মন্ত্রী পটুয়াখালী জেলার ঘূর্ণিদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন।
                                   * প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এক সামরিক আইন জারির মাধ্যমে পাকিস্তান সরকারের প্রাইসেস ও সাপ্লাইজ বিভাগের কন্ট্রোলার জেনারেলের উপর বিক্রেতা, আমদানীকারক ও প্রস্ত্ততকারকদের দ্বারা বিক্রয়যোগ্য মোটরগাড়ির সবের্বাচ্চ মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব অর্পণ করে।
সামরিক আইনের এই ৭১ নং বিধানের নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দামে মোটরগাড়ি কেনাবেচা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিধি অনুসারে কন্ট্রোলার জেনারেলকে বিধি জারির ৭ দিনের মধ্যে মোটরগাড়ির হিসাব গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এই বিধি অমান্য করলে ৩ বছরের সশ্রম কারাদন্ড কিংবা জরিমানা অথবা উভয়দন্ডে দন্ডিত হতে হবে এবং বিধি অমান্যকারীর মোটরগাড়ি বাজেয়াপ্ত হবে।

4TH JANUARY

# পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের ২৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে রমনা গ্রীনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণদানকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এবারের নির্বাচনে এক বাস্তব কর্মসূচির প্রতি রায় দিয়েছে। তিনি বলেন, ৭ কোটি বাঙালি ব্যতীত অন্য কারো ৬ দফা কর্মসূচি পরিবর্তনের অধিকার নেই। নির্বাচনে এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, বাঙালিরা চিরদিনই বাঙালি হিসেবে বেঁচে থাকবে। অতীতেও বাঙালিরা যে কোন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে, এখনও তারা বাঙালি হিসেবেই পরিস্থিতির মোকাবেলা করছে।
বঙ্গবন্ধু বলেন, অতীতে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার জন্য প্রচেষ্টা চালানো হয়। এমনকি আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রচলনের চেষ্টাও করা হয়। আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রতিহত করেছি। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবি নজরুল ইসলামকে বাদ দিয়ে আমরা বাংলা সাহিত্যকে ভাবতে পারি না। তিনি বৃটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালিদের ত্যাগের দৃষ্টান্তস্বরূপ চট্টগ্রাম ও বারাকপুর অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের কথা উল্লেখ করেন। সেসব দেশপ্রেমিকদের সংগ্রামের স্মরণে আওয়ামী লীগ কর্তৃক জালালাবাদে (চট্টগ্রাম) একটি জাতীয় স্মৃতি মিনার নির্মাণ করার কথা তিনি ঘোষণা করেন।
ভোরে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন এবং সকাল আটটায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্রলীগ কর্মীগণ পুষ্প অর্পণ করেন।
                                 # বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণকে তাদের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আরো আত্মত্যাগের জন্য প্রস্ত্তত থাকার আহবান জানান। বঙ্গবন্ধু দেশের ভাবী শাসনতন্ত্র প্রণয়ন সম্পর্কে বলেন, তাঁর দল একাই শাসনতন্ত্র প্রণয়নে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত সদস্যদের এ ব্যাপারে সাদর আমন্ত্রণ জানাবে। অবশ্য তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, যে কোনো অবস্থাতেই তিনি নীতির প্রশ্নে আপোষ করবেন না। বঙ্গবন্ধু আরো বলেন যে, একই স্বার্থবাদী মহল কর্তৃক পশ্চিম পাকিস্তানের দরিদ্র জনসাধারণ সমভাবে শোষিত হয়েছে, সে শোষিত জনগণের স্বার্থেও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।
                                  # পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস এডমিরাল এস. এম আহসান আজ রাওয়ালপিন্ডি যাত্রা করেন। তিনি ৭ জানুয়ারির দিকে এখানে প্রত্যাবর্তন করবেন।
                                 # আজ সমাপ্ত প্রাদেশিক ন্যাপের কার্যকরী কমিটি তিনদিনব্যাপী বর্ধিত সভায় পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব, রাজবন্দিদের মুক্তি এবং খাদ্যসহ নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদির মূল্যহ্রাসের দাবিতে আগামী ২৪ জানুয়ারি প্রদেশব্যাপী দাবি দিবস পালনের আহবান জানিয়েছে। এছাড়া সভার আলোচনা মূলত ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের রূপরেখা, সকল জাতিসত্তার সমানাধিকার ও জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমানাধিকারের নিশ্চয়তা সম্বলিত শাসনতন্ত্র প্রণয়ন এবং গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ক্ষেত্রে আইনগত কাঠামোর সৃষ্ট বিঘ্ন অপসারণের পদ্ধতি সম্পর্কেই অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ত্ব করেন প্রাদেশিক ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ।

5TH JANUARY

* ঢাকায় সংবাদপত্রসূত্রে প্রকাশ পূর্ব পাকিস্তান এবং ত্রিপুরার (ভারত) ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ডিরেক্টরগণ গত শনিবার এখানে সমাপ্ত চারদিনের সম্মেলনে প্রদেশের চারটি জেলার সাথে ত্রিপুরার সীমান্ত চিহ্নিতকরণ ও অন্যান্য প্রশ্ন আলোচনা করেন। ত্রিপুরার ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ডিরেক্টর টি হোসেন পকিস্তানি দলের নেতৃত্ব করেন। সরকারি সূত্রে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ডিরেক্টর সম্মেলনে ফেনী নদী বরাবর চট্টগ্রাম/পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং মাতামুহুরী নদী এলাকার নোয়াখালী/ কুমিল্লার সাথে ত্রিপুরার সীমানা চিহ্নিতকরণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন। ভারতীয় পক্ষ সংশ্লিষ্ট মানচিত্রসমূহ পরীক্ষা করেন এবং পরীক্ষাকার্য সমাপ্ত করার জন্য আরো সময় চান। পূর্ববর্তী বছর সম্পাদিত খন্ড জরিপ সংক্রান্ত ১২টি সিটের প্রাথমিক প্রমান সমীক্ষাও বিনিময় করা হয়।
                                   * রাওয়ালপিন্ডিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে ১৯৭০-৭১ সালের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি পর্যালোচনা করা হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এনইসি’র এই বৈঠকে যোগদান করেন পিন্ডিতে উপস্থিত কেনদ্রীয় মন্ত্রীগণ, পাদেশিক গভর্নরগন, প্রেসিডেন্টের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসজিএমএম পীরজাদা, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এম.এম. আহমদ ও পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান এম এইচ সুফী। আলোচনা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে।

6TH JANUARY

* শেখ মুজিবুর রহমান দলীয় অফিসে অনুষ্ঠিত সভায় গণ-বিরোধী চক্রান্তকারীদের যে কোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবকদের সজাগ থাকার আহবান জানান। যে কোনো উস্কানির মুখে সুশৃঙ্খল থেকে বিগত নির্বাচনের সময়ের মত ঐতিহ্য বজায় রাখতে বলেন। তিনি তাদেরকে জনগণ বিরক্ত হয় এমন কাজ না করতে উপদেশ দেন। তিনি বলেন, জনগণ আওয়ামী লীগের কর্মসূচির প্রতি যে রায় দিয়েছে বিশ্ব ইতিহাসে তা বিরল। অতএব দলীয় কর্মীদের সদা সতর্ক থাকতে হবে। আত্মরক্ষার্থে আপনারা লাঠি তৈরি রাখুন, তবে হাই কমান্ডের অনুমতি ছাড়া আপনারা লাঠির ব্যবহার করতে পারবেন না। সহ্যের সব সীমা অতিক্রম হলে সঠিক নির্দেশ দেওয়া হবে। সভায় দলের সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও সম্পাদক জনাব তাজউদ্দিন আহমদও বক্তৃতা করেন।
                                 * প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান রাওয়ালপিন্ডিতে বলেন, শীঘ্রই তিনি আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বৈঠকে মিলিত হবেন। ইসলামাবাদ বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো ও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথের পাকিস্তান সফরের পরই শেখ মুজিবের সাথে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যেই পিপলস পার্টির চেয়াম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে বৈঠকে মিলিত হয়েছেন।
                                    * কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো চারদিনব্যাপী পাকিস্তান সফরের উদ্দেশ্যে অপরাহ্নে রাওয়ালপিন্ডি এসে পৌঁছান। বিমানবন্দরে প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান তাঁকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। এরপর প্রেসিডেন্ট পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ আবদুল হামিদ খান, পাকিস্তান বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রতিনিধিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। বিমানবন্দরে এক বিবৃতিতে কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও পাকিস্তানি অফিসারদের সাথে দ্বি-স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বহু বিষয়ে মতামত বিনিময়ের তিনি আশা রাখেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান ও কানাডার মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব সম্পর্ক রয়েছে। উভয় দেশই কলম্বো পরিকল্পনা ও কমনওয়েলথভুক্ত রয়েছে। আগামীকাল তিনি ইয়াহিয়ার সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকে মিলিত হবেন।
                                  * পাকিস্তানস্থ হাঙ্গেরীয় দূতাবাসের বাণিজ্যিক উপদেষ্টা পি. ইগারভেরী বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে বর্তমানে ঢাকা সফর করছেন। রাতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল-এ তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়। বেগম ও জনাব এ. সালাম আয়োজিত উক্ত অনুষ্ঠানে নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী, কূটনৈতিক মিশনসমূহের সদস্যবর্গ, শিল্পপতি এবং শহরের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ যোগদান করেন।
                                   * পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক ও কর্মচারি তাদের ১৯ দফা দাবি আদায়ের জন্য ‘ইপরেল’ পাহাড়তলী শাখা ও ওপেন লাইন শাখার উদ্যোগে ভোর ছয়টা হতে ধর্মঘট শুরু করেছে। উল্লেখ্য, তাদের ১৯ দফার মধ্যে বন্যা-বাবদ দুই মাসের অগ্রিম বেতনের দাবিও রয়েছে।

7TH JANUARY

* প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং সফররত কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো রাওয়ালপিন্ডিতে বিশ্ব শান্তির প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেন এবং উভয় দেশের সাধারণ স্বার্থ নীতিসমূহের সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করেন। ইয়াহিয়া খান কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সম্মানার্থে ভোজসভার আয়োজন করেন। উক্ত ভোজসভায় নেতৃদ্বয় পাকিস্তান এবং কানাডার মধ্যে বর্তমান বন্ধুসুলভ সম্পর্ক, সহযোগিতা ও সমঝোতার কথাও উল্লেখ করেন। ভোজসভায় মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, প্রধান নির্বাচনী কমিশনার বিচারপতি আব্দুস সাত্তার এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারিবৃন্দ যোগদান করেন। প্রেসিডেন্ট কানাডার প্রধানমন্ত্রীকে একজন বন্ধু, বিশ্ব রাষ্ট্রনায়ক এবং এক মহান দেশের নেতা হিসেবে স্বাগত জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন যে, তাঁর সফর দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ককে আরো দৃঢ় করবে। তিনি বলেন, উভয় দেশই বিশ্বশান্তি ও শুভেচ্ছা অক্ষুন্ন রাখতে আগ্রহী এবং কমনওয়েলথের ভিতরে বাইরে সাধারণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট অধিকাংশ ব্যাপারে অনুরূপ নীতির অনুসারী। প্রেসিডেন্ট প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বন্ধত্বসুলভ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। অবশ্য তিনি প্রতিবেশী ভারতের সাথে সম্পর্ক কাশ্মীর এবং ফারাক্কা বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়ার দরুন মনোমালিন্যপূর্ণই রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
                                   * ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক সমিতি গঠন করা হয়। ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইকবাল ও চিন্ময় মুৎসুদ্দিকে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে সমিতির ১৩ সদস্য বিশিষ্ট কার্যনির্বাহক পরিষদ নির্বাচিত করা হয়। উল্লেখ্য, দেশের বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কার্যরত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এই প্রথম এ জাতীয় একটি সমিতি গঠন করলেন। শীঘ্রই সমিতির কার্যনির্বাহক পরিষদের সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে অভিষিক্ত হবেন।
                                   * বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণনাশের চেষ্টার অভিযোগে রাতে জনৈক যুবককে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যুবকটি স্বীকার করেছে যে, সে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার জন্যই গিয়েছিলো। সে আরও স্বীকার করে, সংগঠিত দলের (গ্যাং) পক্ষ থেকে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধুর প্রাণনাশের জন্য ট্রেনিং ও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জানা যায় যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সুযোগের সদ্ব্যবহারের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সংগঠিত চক্র বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন রয়েছে।

8TH JANUARY

# বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ পাকিস্তানে দুইদিনব্যাপী সরকারি সফর উপলক্ষে বিমানযোগে রাজধানী নগরী ইসলামাবাদে পৌঁছলে শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। পরে তিনি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদ খান এবং সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রতিনিধিদেরকে মি. হীথের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এই সফরে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর সাথে আগতদের মধ্যে রয়েছেন: বৃটিশ মন্ত্রীসভা সচিব স্যার বার্কট্রেন্ড, পার্লামেন্টারি প্রাইভেট সেক্রেটারি টি পি জে কিটসন এবং বৈদেশিক ও কমওয়েলথ দফতরের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান আই জে এম সুদারল্যান্ড।
                                 # খুলনা নিউজপ্রিন্টের মূল্যবৃদ্ধির একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে সংবাদপত্র শিল্পে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করানোর জন্য পূর্ব পাকিস্তানের দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর একটি দল তাঁর সাথে দেখা করেছেন। বঙ্গবন্ধু ধৈর্যের সাথে প্রতিনিধিদলের বক্তব্য শোনেন এবং তাঁদেরকে আশ্বাস দেন যে, জাতীয় সংবাদপত্রকে এই সমস্যা হতে রক্ষা করার জন্য তিনি চেষ্টা করবেন। আরো জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু ইতিমধ্যেই এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও গভর্নর ভাইস এডমিরাল এস এম আহসানের কাছে বার্তা প্রেরণ করেছেন।
                                   # পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রাদেশিক শাখার যুগ্ম-সম্পাদক কামাল হাসান রিজভী ব্যাংক, বীমা ও পাট ব্যবসায় জাতীয়করণের ব্যাপারে শেখ মুজিব একটি বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় তাঁর দলের পক্ষে তাঁকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, শেখ মুজিবের এ ঘোষণার ফলে দেশের কোটি কোটি নির্যাতিত জনগণের মধ্যে এক নয়া জীবনের সূচনা হয়েছে। তিনি বলেন যে, তার দলের চরম লক্ষ্য দেশে একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটানো এবং মূলত এই উদ্দেশ্যেই গত নির্বাচনে পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে সাম্রাজ্যবাদী তথা প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে।

9TH JANUARY

পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি আবদুল ওয়ালী খান পেশোয়ারে এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধুর প্রাণনাশের পরিকল্পনার নিন্দা করেন এবং চক্রান্তকারীদের উদ্ঘাটন করার জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানান।

বঙ্গবন্ধুর প্রাণনাশের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও স্বস্তি প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধুর নিকট প্রেরিত এক বাণীতে তিনি বলেন, আপনার জীবননাশের চেষ্টার সংবাদ পেয়ে আমি ব্যথিত হয়েছি, তবে সর্বশক্তিমান আল্লাহকে ধন্যবাদ যে, এই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে এবং আপনি রক্ষা পেয়েছেন।

পিডিপি প্রধান নুরুল আমিন বঙ্গবন্ধুর প্রাণনাশের চেষ্টার তীব্র নিন্দা করে বলেন, দেশের দীর্ঘ প্রতিক্ষীত শাসনতন্ত্র প্রণয়নের শুরুতে নানাস্থানে নেতৃবৃন্দ ও ছাত্রদের ওপর হামলা খুব ভালো লক্ষণ না । তিনি একজন প্রাক্তন হাইকোর্ট বিচারপতির নেতৃত্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।

কুমিল্লার বাঞ্ছারামপুর থেকে প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্য গোলাম মহিউদ্দিন (আফতাব) এক বিবৃতিতে ৭ কোটি বাঙালির কণ্ঠস্বর বঙ্গবন্ধুর প্রাণনাশের চেষ্টার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপনপূর্বক এ ব্যাপারে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন।

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী তাঁর টাঙ্গাইলের সন্তোষস্থিত বাসভবনের সামনে অনুষ্ঠিত ‘‘জাতীয় সম্মেলন’’-এ ভাষণদানকালে ১৯৪০ সনের লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান। তিনি কৃষক শ্রমিকের চূড়ান্ত মুক্তির জন্য সমাজতন্ত্র কায়েমের ওপর জোর দেন। লাহোর প্রস্তাব সম্পর্কে বলেন, লাহোর প্রস্তাব না হলে বাংলার মুসলমানরা পাকিস্তানে শরীক হতো না, কলকাতাসহ ১৪টি জেলা হারাতো। তিনি বলেন, কায়েদে আজম বোকা ছিলেন না। তাই তিনি নিজেই লাহোর প্রস্তাবের খসড়া প্রণয়নের সময় ইংরেজী ‘স্টেটস’ (রাষ্ট্রসমূহ) কথাটি প্রস্তাবের মধ্যে রাখেন। অর্থাৎ লাহোর প্রস্তাবে পরিস্কারভাবে দুইটি রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুসলিম লীগ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অথচ সেদিন দওলতানা, খালেকুজ্জামান, রাজা মাহমুদাবাদ প্রমুখ পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচ, পাঠান নির্বিশেষে কোন নেতাই আপত্তি করেনি। মওলানা আবারও ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ দাবির কথা উল্লেখ করেন। তবে তিনি এও বলেন যে, পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে এখানে কোন রাজনীতি চলবে না- এতে খুব সংকট রয়েছে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী ও পররাষ্ট্র দফতরে পূর্ব পাকিস্তানি নেই বললেই চলে। অগাধ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কুটির শিল্প ও ভারী শিল্প হয়নি। এ প্রসঙ্গে তিনি আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, এদেশে কয়লা, তেল, পেট্রোল ইত্যাদি সম্পদ এতো রয়েছে যে, আত্মনির্ভরশীল না হয়ে যায় না। প্রসঙ্গত তিনি বলেন, আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের শোষিত জনতার বিরুদ্ধে নই।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো চারদিনের পাকিস্তান সফর শেষে আজ করাচী থেকে নয়াদিল্লির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পাকিস্তান ত্যাগের প্রাক্কালে কানাডীয় প্রধানমন্ত্রীকে সিন্ধুর গভর্নর লে. জেনারেল রাহমান গুল করাচী বিমানবন্দরে আন্তরিক বিদায় জানান।

পূর্ব বাংলার শ্রমিক ফেডারেশণের কার্যকরী সভাপতি মাহফুজ ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক হায়দার আকবর খান রনো ২০ জানুয়ারি প্রদেশের সকল স্কুল-কলেজ, দোকানপাট, অফিস-আদালতে পূর্ণ হরতালের মাধ্যমে ‘‘আসাদ দিবস’’ পালনের জন্য আহবান জানান। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন যে, ১৯৬৯ সালের এই দিনে বুকের রক্ত দিয়ে আসাদুজ্জামান সেদিনের আন্দোলনে এক নতুন বিপ্লবী উপাদান সংযোজন করেন। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, সেদিন সেই আন্দোলন স্বৈরাচারী আইয়ুব শাহীর পতনের মধ্যে দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে। বিবৃতিতে তাঁরা আশা প্রকাশ করে বলেন যে, পূর্ব বাংলার জাগ্রত জনতা আসাদকে ভোলেনি।

10TH JANUARY

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো পেশোয়ার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় চক আরবার রোডের পাশে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় পুনরায় দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, তাঁর দল পাকিস্তানের সামগ্রিক সংহতির কথা মনে রেখে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য সর্বাধিক সহযোগিতা প্রদান করবে। উক্ত জনসভায় বক্তৃতাদানকালে তিনি আরো বলেন, শাসনতন্ত্র প্রণয়ন একটি সূক্ষ্ম বিষয়, তাই তিনি একে রাস্তায় টেনে আনতে চান না। শাসনতন্ত্র প্রণয়ণের কাজে পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করবো বলে তিনি আশ্বাস প্রদান করেন।

মিসরীয় জাতীয় পরিষদের স্পিকার ড. লাবিব শুকায়ের ঢাকায় বলেন যে, ইসরাইলের অবৈধ অধিকার থেকে কুক্ষিগত আরব এলাকা মুক্ত না করা পর্যন্ত আরব দেশগুলো তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে। আফ্রো-এশীয় গণসংহতি সংস্থার পূর্ব পাকিস্তান কমিটির উদ্যোগে হোটেল পূর্বাণীতে এক সংবর্ধনা সভায় তিনি ভাষণ দেন। ছয় সদস্য বিশিষ্ট এক মিশরীয় পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দল নিয়ে তিনি দুইদিনের সফরে এখানে এসেছেন। আরবদের অধিকারের প্রতি প্রতিনিয়ত সমর্থন করায় তিনি পাকিস্তানি জনগণের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, উপনিবেশবাদী শক্তির সমর্থনপুষ্ট ইসরাইল ক্রমে ক্রমে আরব ভূমি কুক্ষিগত করার নীতি নিয়েছে। আরব ভূমিতে জঘন্য হামলা অব্যাহত রাখার কাজে ইসরাইল বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কাছে থেকে সাহায্য পাচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এর আগে মিসরীয় প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়ে গণসংহতি সংস্থার সাধারণ সম্পাদক কিউ জি আজমেরী আশ্বাস দিয়ে বলেন যে, আরবদের সাথে পাকিস্তানি জনগণ একাত্ম হয়ে থাকবে। সভাপতির ভাষণে আবুল হাশিম বলেন, প্যালেস্টাইনের মুক্তির জন্য এবং ইহুদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে পাকিস্তানের জনগণ সবসময় আরবদের পাশে থাকবে। এই প্রতিনিধিদল গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যান এবং সেখানে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। তাঁরা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিনের মাজারও জিয়ারত করেন। বঙ্গবন্ধু আজ পটুয়াখালীতে ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশের ন্যায়সঙ্গত দাবি পূরণ ও তাদের নিজেদের ভাগ্য ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের অধিকার আর ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব না, কারণ জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমেই এ ব্যাপারে তাদের রায় দিয়েছে। গণবিরোধী শক্তি নির্বাচনের ফলাফলে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেও তাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী আবার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। এছাড়া তাঁর জীবনের উপর সাম্প্রতিক হামলার উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণশত্রুরা পরাজিত হয়ে বাংলার মানুষের কণ্ঠরোধের জন্য অন্য পন্থা অবলম্বন করেছে। বঙ্গবন্ধু নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরাট সাফল্যের সাথেই পাবনার দলীয় নবনির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, খুলনায় একজন আওয়ামী লীগ কর্মী হত্যারও উল্লেখ করেন। বঙ্গবন্ধুর বর্তমান উপকূল এলাকায় সফরকালে আরো কয়েকজন নেতা তাঁর সাথে রয়েছেন। তাঁরা হলেন: জাতীয় পরিষদের নবনির্বাচিত সদস্য মোহাম্মদ মোহসীন, নূরুল ইসলাম মঞ্জু ও কোরবান আলী এবং নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সমাজকল্যাণ সম্পাদক মোস্তফা সারওয়ার। জাতীয় পরিষদের নবনির্বাচিত সদস্য এবং চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ আজিজ শেষরাতে করোনারী থ্রমবোসিস রোগে মাত্র ৫০ বছর বয়সে প্রাণত্যাগ করেন। এ দিন জনাব আজিজ অত্যন্ত কর্মব্যস্ত ছিলেন। তিনি দুইটি জনসভা ও তাঁর সম্মানার্থে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। বিকাল পাঁচটায় বহদ্দর হাটের জনসভায় বক্তৃতাদানের পর নানুপুরের জনসভায় বক্তৃতা দিতে যান এবং সেখানে রাত এগারোটা পর্যন্ত অবস্থান করেন। পাকিস্তান জামাতে ইসলামীর আমীর মওলানা মওদুদী দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন যে, দলের সদস্যপদ বা আমীরের পদ থেকে পদত্যাগের কোন ইচ্ছা তাঁর নেই।
11TH JANUARY

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এসে পৌঁছেন। দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের সাথে কথা প্রসঙ্গে বলেন, চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নব নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য এম. এ আজিজের মৃত্যুর জন্য তাঁকে অবিলম্বে চট্টগ্রাম যেতে হয়েছিলো। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ, খন্দকার মোস্তাক আহমদ এবং ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর সাথে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু আগামীকাল কোন একসময় প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ করবেন।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তাঁর সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ভুট্টোর ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। প্রেসিডেন্ট তেজগাঁও বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনাকালে এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বলেন, "তাঁদের নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে দিন। আমি কেউ না। আমি কোন আলাদা শক্তিও না। আমি রাষ্ট্রের প্রধান এবং আমার স্বার্থ হলো তাঁদের সাথে মিলিত হওয়া এবং আলোচনা করা।" এক প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন যে, তিনি এখনও জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের তারিখ সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি বলেন, "যখন আমি তারিখ ঠিক করে ফেলবো তখন আপনাদের জানাবো।" তিনি কখন বঙ্গবন্ধুর সাথে মিলিত হবেন জানতে চাইলে বলেন, "তিনি ব্যস্ত মানুষ, আমিও ব্যস্ত মানুষ। যখন তাঁর সময় হবে এবং যখন আমারও সময় হবে তখনই আমরা মিলিত হবো।" তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে কী বিষয়ে আলোচনা করবেন জানতে চাইলে বলেন, "এ ব্যাপারে আপনাদের কাছে বলার আমার কিছুই নাই।"

তেজগাঁও বিমানবন্দরে রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের মুক্তিদানের ব্যাপারে ইয়াহিয়া খান বলেন, আমি পূর্বেও বলেছি যে, কোন রাজবন্দী নেই। তখন জনৈক সাংবাদিক সুনির্দিষ্টভাবে জননেতা মণি সিং-এর নাম উল্লেখ করেন। জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন, "মণি সিং কে?" সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক জানান, "মণি সিং নিরাপত্তা আইনে আটক রয়েছেন। তিনি ভিন্ন রাজনৈতিক মত পোষণ করেন।" জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন, "কী সেই ভিন্ন মত?" এর জবাবে অপর একজন সাংবাদিক বলেন, "মণি সিং বামপন্থী মতাদর্শের অনুসারী।" তখন প্রেসিডেন্ট 'বামপন্থী' কথাটির পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, 'তাহলে রাইট কে?' প্রেসিডেন্ট বলেন, 'যে যে মত পোষণ করুণ আমার কোন মত নেই। আমাকে ১২ কোটি লোককে দেখতে হয়। একজন মণি সিং- এর প্রতি আমি নজর দিতে পারি না।'

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তিনদিনব্যাপী পূর্ব পাকিস্তান সফরে ঢাকা আগমন করেন। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনাকালে এই বৎসরের শেষ নাগাদ ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা পোষণ করেন কি না জানতে চাইলে প্রেসিডেন্ট বলেন, 'কেন এতো দীর্ঘ সময়? যদিও আইনগত কাঠামো আদেশে ১শত ২০ দিন সময় ধার্য করে দেওয়া হয়েছে, তবুও এটি ১০ দিনেও হতে পারে বলে আমি আশা করি।'

পাকিস্তান ন্যাপ-এর সভাপতি খান আবদুল ওয়ালী খান জাতীয় একটি গ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ব্যাপারে সকল শক্তি নিয়োজিত করার জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি আহবান জানান। তিনি পেশোয়ারে এক জনসভায় ভাষণদানকালে প্রাদেশিক রাজনীতিতে আব্দুল কাইয়ুম খানের ষড়যন্ত্র ও কোন্দল প্রচেষ্টায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, গত সাধারণ নির্বাচনে জনগণ তথাকথিত জাতীয় আদর্শের রক্ষকদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। অতএব এখন এ জাতীয় ষড়যন্ত্রের অবকাশ নেই। তিনি উপস্থিত জনগণকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এখন প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠন করা, ভাঙ্গার সময় না। ন্যাপ প্রধান আরও বলেন, দেশের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে সম্পদের সুষম বণ্টন করা যাতে বঞ্চিত জনগণ জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনীয় সুযোগ লাভ করতে পারে।

12TH JANUARY


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সকালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রায় দু'ঘণ্টা ধরে অনুষ্ঠিত উক্ত বৈঠকের পর বঙ্গবন্ধু অপেক্ষমান সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের আলোচনা সন্তোষজনক হয়েছে। তিনি আগামীকাল তাঁর দলের কয়েকজন নেতাসহ আবার প্রেসিডেন্টের সাথে মিলিত হবেন বলে জানান। প্রেসিডেন্টের সাথে তিনি কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন তা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বলেন, তিনি এখন কোন কিছু বলবেন না।
আগামীকাল প্রেসিডেন্টের সাথে দ্বিতীয় দফা বৈঠকে তাজউদ্দিন আহমদ, ডক্টর কামাল হোসেন এবং খন্দকার মুশতাক আহমদসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুর সাথে থাকবেন।

পিআইএ কর্মচারীরা আজ রাওয়ালপিন্ডিতে ধর্মঘট শুরু করেন। কর্মচারীরা বেলা নয়টার পর কাজ বন্ধ করে দেয় বলে পিআইএ'র জনৈক কর্মকর্তা জানান। এদিকে করাচী থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, পিআইএ কর্পোরেশন এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি এস. এম ইকবাল বলেছেন, পিআইএ কর্মকর্তারা আমাদের দাবি দাওয়া মেনে না নেওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে। জনাব ইকবাল সংগ্রাম পরিষদেরও সভাপতি।

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস এডমিরাল এম. এম আহসান সাভারে জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় উদ্বোধন করেন।

13TH JANUARY

ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মধ্যে ৩ ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডিস্থ স্বীয় বাসভবনে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনাকালে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিসহ জাতীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে প্রেসিডেন্টের সাথে তাঁর আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, "প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনায় আমরা সন্তষ্ট হয়েছি।" প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনার সময় বঙ্গবন্ধুর সাথে ছিলেন - সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খোন্দকার মোস্তাক আহমদ, তাজউদ্দিন আহমদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান। আলোচনায় প্রেসিডেন্টের সাথে কারা উপস্থিত ছিলেন তা জানা যায়নি। বঙ্গবন্ধু বলেন, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ঢাকাতেই অনুষ্ঠিত হবে। তবে অধিবেশনের তারিখ এখনও নির্ধারিত হয়নি। অধিবেশনের বিভিন্ন সম্ভাব্য তারিখ সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। নিকটবর্তী যে কোন সুবিধামত তারিখে অধিবেশন শুরু হবে। বৈঠকে প্রেসিডেন্টের সাথে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সম্পর্কেই আলোচনা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের সাথে বঙ্গবন্ধুর আর বৈঠক হবে না বিধায় তিনি সাংবাদিকদের আর কোন প্রশ্ন না করার অনুরোধ জানান।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জেড. এ ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডিতে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, দেশের জন্য তিনি একটি গ্রহণযোগ্য ও স্থায়ী শাসনতন্ত্র চান। দেশ হবে একটি খাঁটি ফেডারেশন এবং এভাবে তিনি আওয়ামী লীগের ৬-দফার প্রথম দফাটি সোজাসুজি স্বীকার করে নেন। ভুট্টো বলেন, চলতি মাসের শেষ দিকে তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করার পরিকল্পনা করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি ফেডারেশনের জন্য শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ব্যাপারে মতৈক্য হওয়া উচিত।

ইডেন গার্লস কলেজ ছাত্র ইউনিয়ন শাখার নবীন বরণ ও বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রাক্তন সহ-সভানেত্রী এবং পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদের আহবায়িকা মালেকা বেগম। বিশেষ আমন্ত্রণক্রমে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি নূরুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। সবশেষে নবাগতাদের সম্মানে এক বিচিত্রানুষ্ঠান হয়। বিচিত্রানুষ্ঠানে সঙ্গীতে অংশগ্রহণ করেন, তাজিম সুলতানা, হেলেন আরজু, মেরী, খুকুমণি, পারভীন, লুৎফা, রাণী, রোজী, আজমেরী ও লুলু। কবিতা পাঠ করেন লুলু ফায়েজী, ইফফত মীর্জা। নৃত্য পরিবেশন করেন পলি। অনুষ্ঠানে পুরনোদের পক্ষ থেকে বক্তৃতা করেন দীপা দেব। নতুনদের পক্ষ থেকে আয়েশা সিদ্দিকা শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন।

জে. এম সেন হলে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর বিপ্লবী নেতা সূর্য সেনের স্মৃতি দিবস উদযাপন করা হয়। প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক অধ্যাপক আবুল ফজলের সভাপতিত্বে মাস্টার দা সূর্য সেনের বিপ্লবী জীবনের বিভিন্ন দিক আলোকপাত করে বক্তৃতা করেন সূর্য সেনের অন্যতম সহযোগী পূর্ণেন্দু দস্তিদার, কালিপদ চক্রবর্তী, আবদুস সাত্তার, বিনোদবিহারী চৌধুরী, মওলানা আহমেদুর রহমান আজমী ও অনিল গুহ। মাস্টারদার স্মরণে কবিতা পাঠ করেন দীপক জ্যোতি আইচ। সভায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়:-

১. মাস্টার দা সূর্যসেনের স্মৃতি রক্ষায় রাউজান থানার নয়াপাড়া গ্রামে তাঁর ভিটিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ।

২. ১৯৫৬ সালে জালালাবাদে শহীদ স্মৃতিসৌধ প্রতিষ্ঠার জন্য পূর্ব পাকিস্তান পরিষদে যে সর্বসম্মতি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল আইয়ুবের স্বৈরাচারী শাসনের জন্য তা প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি- এখন ঐ প্রস্তাবকে অবিলম্বে কার্যকর করা হোক।

৩. এই সভা চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ সম্পাদক ও নব নির্বাচিত এম. এন. এ. এম. এ আজিজের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে এবং তাঁর মৃত্যুতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার শপথ গ্রহণ করছে এবং তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করছে।


14TH JANUARY

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর সাথে দুই দিনের বৈঠক শেষে করাচীর উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। ঢাকা ত্যাগের পূর্বে বঙ্গবন্ধুর সাথে তিনি কী আলোচনা করেছেন জানতে চাইলে প্রেসিডেন্ট বলেন, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। শেখ সাহেব ভার নিলে আমি থাকবো না। তিনি আরও বলেন, শ্রীঘ্রই শেখ মুজিবের সরকার হতে যাচ্ছে।

এনা পরিবেশিত খবরে প্রকাশ, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান করাচীর উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগের পূর্বে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "উত্তরাধিকার সূত্রে আমি খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা পেয়েছি এবং আমি তা শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে দিতে যাচ্ছি।" তিনি বলেন, "১৯৬৮ সাল থেকে দেশে ব্যাপক হারে ‘ঘেরাও ও জ্বালাও' চলে এবং তারপর আসে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যা অর্থনৈতিক অবস্থাকে পর্যুদস্ত করার পক্ষে যথেষ্ট।" প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, "আমার কাছে কোন যাদুদন্ড নেই এবং অগ্রগতি সাধনের কোন সংক্ষিপ্ত পন্থা নেই।"

রোকেয়া হল ছাত্রী সংসদের উদ্যোগে রোকেয়া হলের নির্মনায়মাণ শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

15TH JANUARY

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী রাজশাহীতে স্থানীয় মাদ্রাসা ময়দানে এক জনসভায় ভাষণদানকালে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের অবসান ঘটানোর জন্য জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম শুরু করার আহবান জানান। তিনি লাহোর প্রস্তাবের আশু বাস্তবায়নের দাবি জানান। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এ দাবি সমর্থন করে কিনা তা নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি আহবান জানান। ভাসানী বলেন, তিনি জনগণের অন্তরের কথাই ধ্বনিত করছেন। তথাকথিত সংহতির সস্তা শ্লোগান ও 'ইসলাম বিপন্ন' এ ধুয়ায় জনগণকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না। তিনি বলেন, বিগত ২৩ বছরে জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পপতিদের হাতে শোষিত হয়েছে। মওলানা ভাষানী অভিযোগ করে বলেন, শোষকের গুলিতে প্রাণ বিসর্জন দিতে তিনি প্রস্ত্তত কিন্তু জনগণের অধিকারের প্রশ্নে আপোষ করবেন না। এই সভায় জনাব মশিউর রহমানও বক্তৃতা করেন।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আজ করাচীতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ সমাপ্তি উপলক্ষে তা পরিদর্শনকালে বলেন, যে মহান ব্যক্তির বিচক্ষণতা, আন্তরিক ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগে পাকিস্তান অর্জিত হয়েছে কায়েদে আজমের স্মৃতিসৌধ তার স্মৃতিচিহ্ন হয়ে থাকবে। প্রেসিডেন্ট মাজারে ফাতেহা পাঠ করেন।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জেড. এ. ভুট্টো বলেন, জনগণের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন এবং পাকিস্তানের অখন্ডতা ও সংহতির গ্যারান্টি সম্বলিত শাসনতন্ত্র প্রণয়নে তার দল সবরকম সহযোগিতা প্রদান করবে। ভুট্টো সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী বা এরূপ কোনো পদ লাভের অভিলাষ তাঁর নেই। তিনি বলেন, তাঁর দল জনগণের কাছে একটি কর্মসূচি ও ঘোষণাপত্র প্রদান করেছে। সব রকমের শোষণের অবসান ঘটানোর জন্য এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচি রদবদল বা তা হতে সরে যাওয়া যায় না।

'দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার'- এর সংবাদদাতা বিচারাধীন আসামী সৈয়দ নজিউল্লাহকে চিকিৎসার জন্য বিশেষ সামরিক আদালতের নির্দেশে আজ সকালে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। পরে সন্ধ্যায় তাঁকে স্থানীয় কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।

16TH JANUARY

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল সমিতির এক প্রতিনিধি দলকে সাক্ষাৎ দান করেন এবং ধৈর্যের সাথে তাঁদের বক্তব্য শোনেন। প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্ব করেন সমিতির সভাপতি ডা. মোহাম্মদ সালেহ চৌধুরী।

মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব স্যার সলিমুল্লার ৫৫তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন উপলক্ষে ঢাকা শহর কাউন্সিল মুসলিম লীগ এক সভার আয়োজন করে। সভায় মরহুমের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়।

আজ সরকারি মহল সূত্রে ঘোষণা করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান আগামীকাল দুই দিনের সফরে করাচী থেকে লারকানায় পৌঁছবেন। উক্ত সূত্রে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট সকাল ১১টায় বিমানযোগে মহেঞ্জোদারো পৌঁছবেন ও সেখান থেকে ভুট্টোর লারকানাস্থ বাসভবনে আল মুর্তজায় যাবেন। সেখানে তিনি ভুট্টোর সাথে আলোচনায় মিলিত হবেন। পরদিন সকালে প্রেসিডেন্ট হাঁস শিকারের জন্য ব্রিজ লেক যাত্রা করবেন। সেখান থেকে প্রেসিডেন্ট করাচী প্রত্যাবর্তন করবেন। সকালে প্রেসিডেন্ট কায়েকজন এম. এন. এ এবং কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবেন। এ ব্যাপারে ভুট্টোর সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তিনি জরুরি কাজে ব্যস্ত আছেন বলে পিপলস পার্টি সূত্রে জানা যায়। পরে ভুট্টো সাংবাদিকদের বলেন, 'আগামীকাল সম্পর্কে তাঁর কিছু বলার নেই।'


17TH JANUARY


পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জেড এ ভুট্টো এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁর দল জনগণের কাছ থেকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন এবং দৃঢ়ভাবে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন ও গণতন্ত্র পুঃনপ্রতিষ্ঠার পক্ষে ম্যান্ডেট লাভ করেছে। তিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেন, নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে উল্লেখযোগ্য সমঝোতায় আসতে তাঁর দল চেষ্টার কসুর করবে না। টেলিভিশনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির খান আবদুল ওয়ালী খান, কাইয়ুম মুসলিম লীগের সভাপতি মিয়া মমতাজ মোহাম্মদ খান দৌলতানাসহ অন্যান্য দলীয় নেতারও নির্বাচনোত্তর সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দুই দিনব্যাপী লারকানা সফরের উদ্দেশ্যে করাচী থেকে মহেঞ্জোদারো বিমানবন্দরে পৌঁছার পর সাংবাদিকদের সাথে আলোচনায় মিলিত হন। তিনি তাঁর দৃঢ় অবস্থান পুনরুল্লেখ করে বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শাসনতন্ত্র প্রণয়ন সমাপ্ত হবে। আলোচনাকালে প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি ইচ্ছা করে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের ভাবি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নামকরণ করেননি। কিন্তু তিনি তাই পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি বলেন, কারণ শেখ মুজিব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এবং পার্লামেন্টরী পদ্ধতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাই প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকেন। যাই হোক, শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী নাও হতে পারেন। আমি তাঁকে জোর করতে পারি না বলে তিনি উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য প্রেসিডেন্ট লারকানা সফরকালে ভুট্টোর সাথে বৈঠক করবেন। ভুট্টোর পর আর কোনো নেতার সাথে বৈঠকে বসবেন কিনা এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি সব গোপন কথা বলে দেব না, এ ব্যাপারে কিছু করার সময় হয়নি। প্রেসিডেন্টকে ভুট্টোর সাথে বৈঠক সম্পর্কে বলতে অনুরোধ করলে তিনি বলেন, আমি জনাব ভুট্টোর অতিথি। তিনিই আগে কিছু বলবেন, আমি পরে কিছু বলতে পারি। এসময় ভুট্টো যোগ দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রপ্রধানই বলার বিষয় ঠিক করবেন।

ভুট্টোর লারকানাস্থ বাসভবনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো এক দীর্ঘ আলোচনা বৈঠকে মিলিত হন। তাদের দু’জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনার বিষয় সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। তবে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কাছে ভুট্টো সন্ধ্যার দিকে প্রেরিত এক বাণীতে বলেন, আজ সংবাদপত্রের জন্য বলার কিছু নেই। আগামীকাল কিছু বলা যাবে। অবগত মহলের মতে বৈঠক ভুট্টো ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে বেশিরভাগ সময় সীমাবদ্ধ থাকে। তবে কিছুক্ষণের জন্য সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদ খান ও প্রেসিডেন্টের সঙ্গী লে. জে. পীরজাদা বৈঠকে যোগ দেন।

আজ থেকে প্রদেশব্যাপী '১১- দফা সপ্তাহ' শুরু। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ১১- দফার শহীদদের মাজারে পুষ্পমাল্য অর্পণের মাধ্যমে প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের সূচনা করবে। ১১- দফা সপ্তাহের প্রতিটি কর্মসূচিকে সাফল্যমন্ডিত করার জন্য ছাত্র ইউনিয়ন সকল ছাত্র-ছাত্রী ও জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগও ১১-দফা সপ্তাহ পালনে সকাল সাতটায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কালো পতাকা উত্তোলন ও কালো ব্যাজ ধারণের মাধ্যমে প্রথম দিনের কর্মসূচি পালন করবে।

মওলানা ভাসানী পাঁচবিবিতে তাঁর নিজ বাসভবনে এক সাক্ষাৎকারে লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তান সব সময় শোষিত হয়েছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদী মহল ও শাসক শ্রেণী দ্বারা নিপীড়িত হয়েছে। এই শোষণ নিপীড়ন লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বন্ধ হতে পারে বলে তিনি দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করেন। ভাসানী অধিকৃত- কাশ্মীরে শেখ আবদুল্লাহ ও তাঁর সহযোগীদের উপর কাশ্মীরে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা আরোপের নিন্দা করেন। তিনি এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে এ ব্যাপারে দোষীদের গ্রেফতার করার জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানান। তিনি উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলিতে অনিয়মিত ট্রেন চলাচলের সমালোচনা করে যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তদন্ত দাবি করেন।

18TH JANUARY

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন আহুত ১১- দফা সপ্তাহের দ্বিতীয় দিন। এ উপলক্ষে ঢাকায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ছাত্র হলগুলোতে কর্মীসভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, ইডেন গার্লস কলেজ ও টি এন্ড টি কলেজসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মী সভায় মিলিত হয়।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সকালে লারকানা থেকে ২১ মাইল দূরে ড্রিগ হ্রদে পাখি শিকারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে ভুট্টোর বাসভবনে সমবেত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং লারকানার বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রতি বলেন, দেশে জনগণের সরকার ক্ষমতাসীন হলে বর্তমান অনিশ্চিত অবস্থার শীঘ্রই অবসান ঘটবে। প্রেসিডেন্ট আজ করাচীর উদ্দেশ্যে লারকানা ত্যাগের পূর্বে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনাকালে বলেন, ভুট্টোর সাথে তার আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা খোলামনে মতবিনিময় করেছি। ভুট্টো ও আমার মত অনেক ব্যাপারেই মিলে গেছে। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি কোনো কিছু বলা যাবে না। তিনি বলেন যে, ভুট্টো ও শেখ মুজিবুর রহমান পরস্পরের সাথে আলোচনা করবেন। প্রেসিডেন্ট এই সফরকে তাঁর অবকাশ সফর বলে জানান।

19TH JANUARY

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ জন বিশিষ্ট শিক্ষক এক যুক্ত বিবৃতিতে জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থাকে (বিএনআর) জাতীয় একাডেমীতে রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে অবিলম্বে পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক স্বার্থ-বিরোধী এই সংস্থা বিলোপের দাবি জানান। উল্লেখ্য, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান এই সংস্থা (বিএনআর) প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর কার্যকলাপ গণমনে সন্দেহের সৃষ্টি করে। এই সংস্থা আজো পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে ধ্বংস করার প্রয়াসে নিযুক্ত প্রতিক্রিয়ার ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এই সংস্থা বিলোপের বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক (বাংলা), ড. মোফাজ্জল আহমদ চৌধুরী (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ড. ওয়াহিদুল হক (অর্থনীতি), ড. আহমদ শরীফ (বাংলা), অধ্যাপক রেহমান সোবহান (অর্থনীতি), ড. রমজান আলী সরদার (গণিত), অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (বাংলা), অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ মিয়া (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ড. হানিফ ফউক (উর্দু), ড. আবুল খায়ের (ইতিহাস), ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (ইংরেজী), ড. বিলায়েত হোসেন (পদার্থবিদ্যা), ড. জিল্লুর রহমান খান (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ড. অজয় রায় (পদার্থবিদ্যা), অধ্যাপক জয়নুল আবেদীন (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), অধ্যাপক সাদ উদ্দিন (সমাজবিজ্ঞান), অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন (ইতিহাস), অধ্যাপক আহসানুল হক (ইংরেজী) ও অধ্যাপক লুৎফুল হক (ভূগোল)।

পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদের আহবানে দ্রব্যমূল্য হ্রাস ও মহিলাদের চলাফেরার নিশ্চয়তা বিধানের দাবিতে রাজধানীতে সমাবেশ, মিছিল ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারী মহিলারা মিছিল করে প্রাদেশিক গভর্নর ভবনের সামনে যান এবং বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল গভর্নরের সাথে দেখা করেন, স্মারকলিপি পেশের চেষ্টা করেন; কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার জন্য তাঁরা ব্যর্থ হন। পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদের সভানেত্রী কবি সুফিয়া কামাল এই সমাবেশে সভানেত্রীত্ব করেন। সভায় বক্তৃতা করেন মিসেস হামিদা রহমান। তিনি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মহিলাদের চলাফেরায় নিরাপত্তাসহ বন্যা সমস্যার জরুরি সমাধান দাবি করেন। সভায় মতিয়া চৌধুরীও বক্তৃতা করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, রাজনৈতিক নেতা, কর্মী ও ছাত্রদের গ্রেফতারের সময় প্রশাসন কর্তৃপক্ষ একেবারে 'ন্যাকা' সেজে থাকেন। তিনি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। সভানেত্রীর ভাষণে বেগম সুফিয়া কামাল মহিলাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায় মহিলাদের সংগঠনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হতে আহবান জানান।

রাওয়ালপিন্ডির সাপ্তাহিক 'ইন্টার উইং' পত্রিকায় একটি নিবন্ধ প্রকাশের অভিযোগে বিচারাধীন শামসুদ্দোহা ও সৈয়দ নজিউল্লাহ আজ তাঁদের কৌশলী প্রত্যাহার করেছেন। তাঁরা আদালতকে জানান, তাঁরা আদালতে সরকারি সাক্ষীদের কোনো জেরা অথবা আদালতে কোনো বিবাদী সাক্ষী দাঁড় করাবেন না। তারা বলেন, আমরা এটা আদালতের কৃপার উপর ছেড়ে দিয়েছি। আদালত শামসুদ্দোহার জামিনের আবেদন নাকচ করে দেয়। অন্যদিকে কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতাল থেকে সৈয়দ নজিউল্লাহর স্বাস্থ্য সম্পর্কিত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত তাঁর জামিনের আবেদন বিবেচনাধীন রয়েছে।

সিন্ধু জাতীয় ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আহমদ খান জামিলী নয়া শাসনতন্ত্রে পাকিস্তানকে একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করার জন্য জাতীয় পরিষদের সদস্যদের প্রতি আহবান জানান। এক বিবৃতিতে তিনি নয়া শাসনতন্ত্রে সকল প্রদেশকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদানের দাবি জানান। তিনি বলেন, সিন্ধি, বেলুচ, পশতু ও পাঞ্জাবিকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এবং সংশ্লিষ্ট প্রদেশের সরকারি ভাষা ঘোষণা করা উচিত। তিনি দ্বি- কক্ষ আইন পরিষদ এবং জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা একশত একর ধার্য করার সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, সিন্ধুর সরকারি ভাষা শুধুমাত্র সিন্ধি হওয়া উচিত এবং সিন্ধি ভাষায় সিন্ধু পরিষদের কার্যবিবরণী পরিচালনার দাবি জানান।

20TH JANUARY

১১- দফা সপ্তাহের আজ চতুর্থ দিন। এ উপলক্ষে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের পৃথক আহবানে শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। ১১- দফা সপ্তাহের অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে ছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের আহবানে বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র জমায়েত, সকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে যথাক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় বটতলা ও মধুর কেন্টিনে ছাত্র সভা। বিকালে পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে পল্টন ময়দানে এক জনসভা ও ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর উদ্যোগে গণ-সঙ্গীতের আসর অনুষ্ঠিত হয়।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৫দিন করাচীতে অবস্থানের পর আজ সকালে রাওয়ালপিন্ডি এসে পৌঁছেন।

পাঞ্জাব কাউন্সিল সুসলিম লীগের সভাপতি সরদার শওকত হায়াত খাঁ প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং কিছু সময় তাঁর সাথে অবস্থান করেন।


21TH JANUARY

২১-দফা সপ্তাহ পালনের আজ পঞ্চম দিন। এ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্রদের এক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম এবং বক্তৃতা করেন ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা শহর সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক নিজামউদ্দিন আজাদ, কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সম্পাদক আবুল কাশেম, কেন্দ্রীয় সংসদের সহ সভানেত্রী আয়শা খানম।
সভায় অবিলম্বে নিরাপত্তা আইনে আটক জননেতা মণি সিংসহ সকল ছাত্র, শ্রমিক ও রাজবন্দীর মুক্তি, আইনগত কাঠামো আদেশ বাতিল, গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র রচনার দাবি কমিউনিস্ট পার্টির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার প্রভৃতি দাবি সম্বলিত প্রস্তাব গৃহীত হয়।

আজ 'শহীদ আনোয়ারা দিবস'। এ উপলক্ষে নাখালপাড়া আওয়ামী লীগ মহিলা শাখার উদ্যোগে ৫০৭ নং নাখালপাড়ায় এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভানেত্রীত্ব করেন বেগম জেবুন্নেসা এবং প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করেন নগর আওয়ামী লীগ মহিলা সম্পাদিকা বেগম সাজেদা চৌধুরী। এছাড়া 'শহীদ আনোয়ারা দিবস' উপলক্ষে সকাল সাতটায় শহীদ আনোয়ারার বাসভবনে কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণপূর্বক খালি পায়ে মিছিল করে শহীদ আনোয়ারার মাজারে গমন এবং সেখানে ফুল দেয়ার পর মোনাজাত করা হয়।

কো-অর্ডিন্যান্স কাউন্সিল অব এসোসিয়েশন অব দি পাবলিক এমপ­য়িজ অব পাকিস্তান (কোকাপেপ) কর্তৃক এ. জি. ই. পি প্রাঙ্গণে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মচারীদের এক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় জীবনধারণের ব্যয়বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে অনতিবিলম্বে অন্তর্বর্তীকালীন বেতন মঞ্জুর করার দাবি জানানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন এম এ রশীদ।

22TH JANUARY

রাওয়ালপিন্ডিতে 'ইন্টার উইং' পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধের জন্য ‘পাকিস্তান অবজারভার’ এর প্রতিনিধি সৈয়দ নজিউল­াহ ও 'ইন্টার উইং' পত্রিকার সম্পাদক এ আর দোহার বিরুদ্ধে আনীত মামলার শুনানি শেষ হয়েছে। তাঁরা তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খন্ডন করে আজ জবাব দান করেন। তাঁরা যুক্তি দাখিল করে বলেন যে, তাঁরা দোষী নন। উক্ত সাপ্তাহিকীর মুদ্রাকরকে প্রেস এন্ড পাবলিকেশন অর্ডিন্যান্সের আলোকে জেরা করা হয়। এর আগেও তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছিল। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে জেলে প্রথম শ্রেণীর ব্যবস্থা করা ও রাওয়ালপিন্ডিতে রাখার জন্য আবেদন করা হয়েছে।

ঢাকায় নিযুক্ত যুগোসে­াভিয়ার কন্সাল মি. মিরকোই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খন্দকার মোস্তাক আহমেদের সাথে এক বৈঠকে মিলিত হন।

পাকিস্তান গার্ল গাইড সমিতির কমিশনার বেগম জি. এ. খান প্রেসিডেন্টের পূর্ব পাকিস্তান সাহায্য তহবিলে সমিতির পক্ষ থেকে দশ হাজার টাকা সাহায্য প্রদান করেন। এ নিয়ে সমিতির পক্ষ থেকে সর্বমোট পঁচিশ হাজার টাকা সাহায্য দেওয়া হয়।

23TH JANUARY


পিপলস পার্টির হাই কমান্ড ১৮ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি আজ সকালে জেড. এ. ভুট্টোর ক্লিফটনস্থ বাসভবনে তাঁর সভাপতিত্বে বৈঠকে মিলিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, জনাব ভুট্টো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাতের জন্য ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব করবেন। বৈঠকের প্রথম অধিবেশনের পর পিপলস পার্টির করাচী অঞ্চলের চেয়ারম্যান এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবদুল হাফিজ পীরজাদা সাংবাদিকদের উক্ত তথ্য প্রদান করে বলেন, তাদের দলীয় প্রতিনিধিদল পাঁচদিন ঢাকায় অবস্থান করবে।

টঙ্গী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির উদ্যোগে টঙ্গী বোর্ড বাজারে অনুষ্ঠিত এক বিরাট জনসভায় ১১-দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা, বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের জাতিগত সমস্যা সমাধানের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদানের দাবি জানানো হয়। জনসভায় ন্যাপ নেতা শ্রী মণীন্দ্র গোস্বামী সভাপতিত্ব করেন। এছাড়া প্রাদেশিক ন্যাপ সম্পাদক সৈয়দ আলতাফ হোসেন টঙ্গী জয়দেবপুর থানা ন্যাপ শাখার সভাপতি সিরাজুল হক বক্তৃতা করেন। সৈয়দ আলতাফ হোসেন ১১-দফা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন যে, ন্যাপ এর লক্ষ্যে উপণীত হওয়ার জন্য বিরামহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। সভায় গৃহীত প্রস্তাবে মণি সিংসহ সকল রাজবন্দীর অবিলম্বে মুক্তি দাবি করা হয়।

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন আহূত ১১-দফা সপ্তাহের আজ শেষ দিন। এ উপলক্ষে ঢাকায় ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে 'মশাল মিছিল' বের করা হয়। 'মশাল মিছিল' কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বের হয়ে বিভিন্ন রাজপথ প্রদক্ষিণ করে। মিছিলে '১১-দফার সংগ্রাম চলবেই', 'শোষক গোষ্ঠীকে খতম কর', 'বিপ­বী সংগ্রাম গড়ে তোলো', 'জেলের তালা ভাঙবো রাজবন্দীদের আনবো', 'জননেতা মণি সিং-এর মুক্তি চাই', 'কমুনিস্ট পার্টিকে বেআইনী রাখা চলবে না', 'চাল ডাল তেলের দাম কমাতে হবে', 'অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা চাই নইলে এবার রক্ষা নাই' ইত্যাদি সে­াগান প্রদান করে। সবশেষে মিছিলটি বাহাদুর শাহ পার্কে এসে সংক্ষিপ্ত সভায় মিলিত হয়। সেখানে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলামের ভাষণের মধ্য দিয়ে ১১-দফা সপ্তাহের কর্মসূচি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।

১১-দফা সপ্তাহের শেষ দিনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের উদ্যোগেও ঢাকার বায়তুল মোকাররম থেকে 'মশাল মিছিল' বের করা হয়। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে।

24TH JANUARY

শোষণমুক্তির সংগ্রামের নবতর বলিষ্ঠ শপথ গ্রহণের মাধ্যমে প্রদেশের সর্বত্র ১১-দফার মহান 'গণ-অভ্যুত্থান দিবস' পালিত হয়। এই দিবসে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব বাংলা বিপ­বী ছাত্র ইউনিয়ন, পূর্ব বাংলা ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলা ছাত্রলীগ, নবকুমার ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা গঠিত মতিউর স্মৃতি কমিটি- প্রভাতফেরী, মিছিল, পথসভা ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করে। বিভিন্ন কলকারখানার শ্রমিক ও অন্যান্য সংগঠনও এই দিবস পালন করে। ঢাকা শহর আওয়ামী লীগ ও জাতীয় শ্রমিক লীগ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের কর্মসূচি বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করে। সব অনুষ্ঠানেই ১১-দফার পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১১-দফা ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন, রাজবন্দীদের মুক্তি, দ্রব্যমূল্য হ্রাস, বকেয়া খাজনা মওকুফ ও সর্বোপরি জাতীয় পরিষদের সার্বভৌমত্বের দাবি সোচ্চার হয়ে ওঠে।

গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ আহূত জনসভায় সভাপতির ভাষণে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি নূর-এ-আলম সিদ্দিকী বলেন যে, দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রে যদি ৬-দফা ও ১১-দফার একটি দাড়ি-কমাও বাদ দেওয়া হয় তাহলে তুমুল প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে যাতে খাজনা-ট্যাক্স প্রদান বন্ধ হবে, অফিস আদালত, কল-কারখানায় তালা ঝুলানো হবে। জনসভায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি আ. স. ম আব্দুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখন, ছাত্রলীগের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক ও নব-নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য খালেদ মোহম্মদ আলী প্রমুখ বক্তৃতা করেন। সভাশেষে একটি গণসঙ্গীতের আসর অনুষ্ঠিত হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সঙ্গীত শিল্পীসমাজ কর্তৃক তাঁর সন্মানে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন। ভাষণদানকালে তিনি বলেন যে, বাংলার মহান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও অন্যান্যদের প্রতি উপযুক্ত সন্মান প্রদর্শন করা হয়নি। তিনি শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবীদের আশ্বাস প্রদান করেন যে, দেশের এই অংশে পৃথক ও সাধারণ একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা হবে। বঙ্গবন্ধু অভিযোগ করে বলেন, বিগত বছরগুলিতে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে শাসকগোষ্ঠী ও প্রতিক্রিয়াশীল চক্র নিজেদের স্বার্থে বিকৃত করেছে। রেডিও পাকিস্তান নজরুল সঙ্গীতের শব্দ পরিবর্তন করে প্রচার করেছে। আমাদের মেয়েরা কপালে টিপ পরলে তাদের হিন্দু আখ্যায়িত করার জন্য তথাকথিত পূজারীরা উঠে পড়ে লাগতো। তিনি বলেন, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম শুধু জনগণ এবং রাজনীতিকদের একার দায়িত্ব নয়। জাতীয় কল্যাণে শিল্পীরাও বিরাট দায়িত্ব পালন করতে পারে। বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, দেশাত্ববোধক সঙ্গীত রচনা করার জন্যই বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকে কারাগারে যেতে হয়েছিল। অনুষ্ঠানে সভানেত্রীত্ব করেন প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী লায়লা আর্জুমান্দ বানু। বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তৃতা করেন সঙ্গীতশিল্পীদের পক্ষ থেকে সুরশিল্পী সমর দাস, কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমান, সৈয়দ আবদুল হাদী, আঞ্জুমান আরা বেগম, মুস্তফা জামান আববাসী প্রমুখ।

১১-দফা গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম বীর শহীদ কিশোর মতিউর রহমানের আজ দ্বিতীয় স্মৃতিবার্ষিকী। এ উপলক্ষে ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটে এক ছাত্র জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই ছাত্র জনসভায় শহীদ মতিউর রহমানের পিতা আজহারুল হক মলি­ক, ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি আ. স. ম আব্দুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন প্রমূখ বক্তৃতা করেন। এছাড়া শহীদ মতিউর স্মৃতি স্মরণে নবকুমার ইনস্টিটিউটের ছাত্ররা কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরী, কোরআনখানি প্রভৃতি কর্মসূচি পালন করে।

পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কে. জি মোস্তফা পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের তিনদিন ব্যাপী বার্ষিক সাধারণ সভার উদ্বোধনী ভাষণে সাংবাদিকদের দ্বিতীয় বেতন বোর্ড অবিলম্বে সক্রিয় করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান। তিনি প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স বাতিল, জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরো ও পাকিস্তান কাউন্সিল বিলুপ্তির দাবি করেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল­াহ কায়সার। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অব্যাহত রাখার জন্য আহবান জানান এবং অবিলম্বে সৈয়দ নজিউল­াহ ও শামসুদ্দোহাসহ দেশের সকল রাজবন্দীর মুক্তি দাবি করেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে কূটনৈতিক মিশনের সদস্য ছাড়াও বেশকিছু গণ্যমান্য অতিথি যোগদান করেন।


25TH JANUARY


প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক ঘোষণা সত্ত্বেও ছাত্রনেতা মাহবুব উল­াহসহ বহু রাজবন্দী মুক্তি না পাওয়ায় প্রদেশের ১১ জন বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কবি এক যুক্ত বিবৃতিতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন এবং অবিলম্বে ছাত্রনেতা মাহবুব উল­াহসহ সকল রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র ও শ্রমিক বন্দীর মুক্তি দাবি করেন। বিবৃতিতে স্বাক্ষর দাতারা হলেন, শহীদুল­াহ কায়সার, আলী আশরাফ, আতাউস সামাদ, হাসান হাফিজুর রহমান, কামাল লোহানী, নির্মল সেন, ফজল শাহাবুদ্দিন, সানাউল­াহ নূরী, আহমেদ হুমায়ুন, ফকির আশরাফ ও শামসুর রহামন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ভুট্টোর আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের প্রথম পর্যায়ে পিপলস পার্টির চার সদস্যের একটি দল ঢাকার উদ্দেশ্যে করাচী ত্যাগ করে। দলের মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মিরাজ মোহাম্মদ খান, ড. মোবাসসির, হানিফ রামে, জহির মোহাম্মদ খান। দলীয় নেতা তারিক আজিজ দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি দলের সাথে থাকবেন।

বিশ্বব্যাংক প্রকল্পসমূহের প্রধান বার্নার্ড চাদেনেট চারদিনব্যাপী পূর্ব পাকিস্তান সফরের উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন থেকে ঢাকা আগমন করেন। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানকালে তিনি ঘূর্ণিবাত্যা বিধ্বস্ত অঞ্চলের পুনর্গঠন কর্মসূচি এবং প্রদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যকরী কর্মসূচির পর্যালোচনা করবেন।

ভুট্টো করাচীতে বলেন যে, সিন্ধুর জনগণের ইচ্ছানুযায়ী ভাষা সমস্যার একটি কার্যকরী ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান বের করার উদ্দেশ্যে তার দল শীঘ্রই একটি কমিটি গঠন করার পক্ষপাতি। প্রস্তাবিত কমিটি ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদদের নিয়ে গঠন করা হবে এবং তারা সামগ্রিক ভাষা প্রশ্নটি পর্যালোচনা করে সিন্ধু প্রদেশের জনগণের ইচ্ছানুযায়ী এর সমাধান করবেন। সিন্ধু প্রদেশে উর্দু ও সিন্ধু উভয় ভাষাই যোগ্যস্থান লাভ করবে বলে ভুট্টো জানান। তিনি বলেন, শীঘ্রই একটি গণসরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। কাজেই ভাষার এই প্রশ্নটি মিমাংসার দায়িত্ব গণপ্রতিনিধির ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। ভুট্টো বলেন যে, সরকার গঠন করা আমাদের প্রথম কাজ। কেননা জনগণ এরই ম্যান্ডেট প্রদান করেছে। ভাষা প্রশ্ন নিয়ে বিরোধে অবতীর্ণ না হওয়া এবং নিজেদের কায়েমী স্বার্থবাদীদের দ্বারা বিভ্রান্ত না হতে দেওয়ার জন্য ভুট্টো সিন্ধি ও অসিন্ধিদের প্রতি আবেদন জানান।

26TH JANUARY


মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকনাথ ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেন, একমাত্র লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তান গঠনের মাধ্যমেই বাঙালিদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সকল প্রকার শোষণের অবসান হতে পারে। এর জন্য অবিলম্বে ৭ কোটি পূর্ব পাকিস্তানির আন্দোলন শুরু করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ১৯৪৭ সাল থেকে তিনি লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। এতে পূর্ব বাংলা স্বাধীন রাজ্য গঠনের প্রস্তাব ছিল বলে তিনি উলে­খ করেন। নিজেদের মুক্তিলাভের জন্য তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে সর্বস্ব ত্যাগের জন্য প্রস্ত্তত থাকার আহবান জানান। শাসক শ্রেণীকে জনগণের মনোভাব উপলব্ধি এবং জনগণের ইচ্ছার প্রতি নতি স্বীকার কারার আহবান জানান। তিনি আরও বলেন, বৃটিশ সরকার এদেশ থেকে হাত গুটিয়ে নিলেও এখনও এদেশে শোষণের অবসান হয়নি, বরং জনগণ এখন অন্য ধরনের সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা শোষিত হচ্ছে। শোষণের ধারা ও তার পরিণতি সম্পর্কে জনগণের পরিস্কার ধারণা সৃষ্টি হয়েছে এবং জনগণের মুক্তি আন্দোলন ঠেকাতে পারে এমন কোন শক্তি পৃথিবীতে নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে নিখিল পাকিস্তান স্বর্ণকার ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির এক প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে প্রতিনিধিদল স্বর্ণকার ও স্বর্ণব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সম্পর্কিত একটি স্মারকলিপি বঙ্গবন্ধুর কাছে পেশ করেন। তারা স্বর্ণের ওপর ধার্যকৃত ১০ ভাগ বিক্রয় করের দরুণ উদ্ভুত পরিস্থিতি ব্যাখ্যাকালে জানান, এর ফলে ইতিমধ্যেই বহু স্বর্ণালঙ্কার প্রস্ত্ততকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ৫০ লক্ষ লোক বেকার হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব করেন সমিতির আহবায়ক চৌধুরী খুরশীদ আহমদ নাসের, সাধারণ সম্পাদক নাসের আহমদ নাসের।

করাচীতে প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এম. এম. আহম্মদ করাচীস্থ শিল্প ও বণিক সমিতির সভায় বলেন, দেশের রফতানি বাণিজ্যে সহায়তা করার জন্য শীঘ্রই আমদানি রফতানি ব্যাংক ধরনের একটি অত্যন্ত বিশেষজ্ঞ ব্যাংক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হবে। সভায় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারি খাতে হবে কী না তা এ মুহূর্তে তার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। অপর এক প্রশ্নকর্তাকে তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তটি একটি স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত এবং সম্প্রতি ঋণের ব্যাপারে যে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে তার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। অপর এক খবরে প্রকাশ, এম. এম. আহম্মদকে উক্ত সভায় জনৈক সদস্য মুদ্রামান হ্রাস করার সম্ভাবনা আছে কি না জিজ্ঞাসা করলে তিনি এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।


27TH JANUARY

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনার উদ্দেশ্যে পিপলস পার্টি প্রধান ভুট্টো করাচী থেকে ঢাকা আগমন করেন। ঢাকা বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান, আওয়ামী লীগ নেতা কামরুজ্জামান, তাজউদ্দিন আহমদ ও জহীরুদ্দিন। পিপলস পার্টির কর্মী, সমর্থকগণ বিভিন্ন সে­াগান সহকারে বিমানবন্দরে ভুট্টোকে অভ্যর্থনা জানায়। ঢাকা পৌঁছার পর ভুট্টো বাংলা ভাষা আন্দোলনের স্মরণে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পরিদর্শন করেন।

ভুট্টো তেজগাঁও বিমানবন্দরে পৌঁছার পর ভি আই পি লাউঞ্জে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনায় মিলিত হন। আলোচনাকালে আওয়ামী লীগ যদি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে তাহলে তাঁর মনোভাব কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে আমি শ্রদ্ধা করি।" তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে সরকার গঠন এবং পরিচালনা করা সম্ভব, কিন্তু একটি ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ব্যাপারে "ঐকমত্যই হচ্ছে গণতন্ত্রের সারবস্ত্ত।" ভুট্টো আওয়ামী লীগের ৬-দফা পড়ে দেখেছেন কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আপনি কী মনে করেন আমি আমার ঘরের পড়াশুনা করি না।"
৬-দফার প্রথম দফাটি তিনি যেখানে মেনে নিয়েছেন, সেখানে বাকি ৫টি দফা সম্পর্কে তাঁর মনোভাব কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাঁচটি দফা আলোচনা করা হবে। তিনি জানান, এ বিষয়ে আর কিছু বলবেন না। কারণ এতে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে এবং আওয়ামী লীগের সাথে তাঁর আলোচনা বিঘ্নিত হতে পারে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভুট্টো শাসনতন্ত্র বিষয়ে আলোচনার জন্য বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠক শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তান সময় সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে এবং শেষ হয় ৮টা ২৫ মিনিটে। ৭৫ মিনিট স্থায়ী এই বৈঠকে তাঁদের সাথে কোন সহযোগী ছিলেন না। বৈঠক শেষে ভুট্টো প্রথমেই অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, "শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করতে পেরে আমি আনন্দিত। আমরা বহু বিষয়ে আলোচনা করেছি।" বঙ্গবন্ধু বলেন, "আমরা সবেমাত্র আলোচনা শুরু করেছি এবং তা অব্যাহত রাখবো।" বঙ্গবন্ধু এবং ভুট্টো যখন বৈঠক চালাচ্ছিলেন তখন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, কামরুজ্জামান প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতা এবং পিপলস পার্টির অন্যান্য নেতা অপর একটি কক্ষে অপেক্ষা করছিলেন। আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম একবার বৈঠক কক্ষে কয়েক মিনিটের জন্য ঢুকে বের হয়ে আসেন।

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস এডমিরাল এস. এম. আহসান ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ বাহিনীর বার্ষিক কুচকাওয়াজে বক্তৃতাকালে পুলিশ বাহিনীকে জনসাধারণের জন্য ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতার সাথে কর্তব্য পালনের আহবান জানিয়েছেন। গভর্নর পুলিশ বাহিনীর কুচকাওয়াজ পরিদর্শন এবং সাহসিকতার জন্য কায়েদে আজম পুলিশ পদক ও প্রেসিডেন্টের পুলিশ পদক বিতরণ করেন। গভর্নর বিগত নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা ছাড়া দেশের অগ্রগতি হতে পারে না। কাজেই পুলিশ বাহিনীকে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

28TH JANUARY

বঙ্গবন্ধু ও ভুট্টোর মধ্যে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ভুট্টোর কক্ষে দ্বিতীয় দফা রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শুরু হয় বিকাল পৌঁনে পাঁচটায় এবং শেষ হয় ৫টা ৫৫ মিনিটে। দীর্ঘ ৭০ মিনিটকাল আলোচনার পর তা আগামীকাল পর্যন্ত মুলতবি রাখা হয়। জাতীয় পরিষদ অধিবেশনের তারিখ নির্ধারণ সম্পর্কে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে কী না এ প্রশ্নের জবাবে ভুট্টো বলেন, "আমাদের আলোচনার ক্ষেত্র বিশাল- তার কিছু আমরা আলোচনা করেছি আর বহু বিষয়ে আমরা আলোচনা করবো।"
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, "জাতীয় সকল সমস্যা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি।" তাঁদের আলোচনা সন্তোষজনক বলে জানা গেছে। তবে তাঁরা কী আলোচনা করেছেন তা প্রকাশ পায়নি।

পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (হাজারভী)-এর সভাপতি পীর মোহসেন উদ্দিন আহমদ (দুদু মিয়া) এক বিবৃতিতে মুজিব-ভুট্টো বৈঠকের সাফল্য কামনা করেছেন বলে এপিপি'র খবরে প্রকাশ।

তুরস্কের সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এহসান সাবরী কাগলায়াঙ্গীল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন।

মওলানা ভাসানী ফেনীতে এক জনসভায় বক্তৃতাকালে বলেন, কেবলমাত্র লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নের মাধ্যমেই পশ্চিমাঞ্চলীয়দের সকল প্রকার শোষণ বন্ধ করা সম্ভব। তিনি বলেন, পাক-ভারত উপমহাদেশের ১০ কোটি মুসলমানের প্রতিনিধি উক্ত প্রস্তাবে সম্মতি দান করেন। তিনি লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠনের দাবি জানান এবং বাঙালিরা যাতে সব রকমের শোষণ থেকে মুক্তি পেতে পারে তার জন্য তিনি লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। ৭ কোটি বাঙালির আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্য তিনি নবনির্বাচিত এম এন এ দের প্রতি আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর প্রতি আশীর্বাদ জ্ঞাপন করে তিনি বলেন, খোদা যেন শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশের অশুভ শক্তির মোকাবেলা করার মতো শক্তি দান করেন। আওয়ামী লীগের সাথে সংঘর্ষে না আসার জন্য তিনি দলীয় কর্মীদের নির্দেশ দেন। নব-নির্বাচিত এম এন এ দের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে মওলানা ভাসানী বলেন, তাঁরা বাংলার জনগণের দাবি পূরণ না করলে বাঙালিরা তাঁদের ক্ষমা প্রদর্শন করবে না।

ইরানের সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরদেশীয় জাহেদী সকালে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ভুট্টোর সাথে এবং বিকালে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। জাহেদী ভুট্টোর সাথে ৭০ মিনিট এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রায় আধাঘণ্টা অতিবাহিত করেন বলে এপিপি ও এনা পরিবেশিত খবরে প্রকাশ।

সিন্ধুর গভর্নর লে. জেনারেল রাখমান গুল একদিনের সফরে এসে শুক্কুর রেল স্টেশনে সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করে বলেন, ভাষা এমন একটি সমস্যা নয়, যা নিয়ে এ স্তরে একটি আন্দোলন যুক্তিযুক্ত হতে পারে। এ ধরণের আন্দোলনের কোন কারণ আমি খুঁজে পাই না, যদি না এর পিছনে কোন মতলব থাকে। গভর্নর বলেন, ভাষা সমস্যাটি গণতান্ত্রিকভাবে নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। আমরা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করেছি, এই প্রতিনিধিরা আইন পরিষদে বসে গণতান্ত্রিকভাবে এই সমস্যাটির নিষ্পত্তি করতে পারেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। ভাষা সমস্যার মতো সমস্যাগুলো সাধারণত পরিষদেই নিষ্পত্তি হয়ে থাকে বলে তিনি জানান।

ঢাকার হাইকোর্টের ৩২ জন আইনজীবী এক যুক্ত বিবৃতিতে ঘূর্ণিদুর্গতদের সাহায্যে এ যাবৎ প্রাপ্ত অর্থ ও সাহায্য দ্রব্যাদি যেখানে যা ব্যয় করা হয়েছে তা-সহ সমুদয় প্রাপ্ত ত্রাণের পূর্ণ হিসাব প্রকাশের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান। তাঁরা একই সঙ্গে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রদত্ত বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ যেসব এলাকায় যে যে শর্তে ব্যয় করা হয়েছে তা-সহ প্রাপ্ত সকল বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের পূর্ণ হিসাব প্রকাশের জন্যও পাকিস্তান সরকারের কাছে দাবি জানান।


29TH JANUARY

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভুট্টোর প্রাথমিক আলোচনা ঢাকায় শেষ হয়েছ। তাঁরা শাসনতন্ত্র প্রণয়নসহ বিভিন্ন জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আলোচনায় কেউ মতৈক্যে পৌঁছতে পারেননি। উভয়ই আরও আলোচনার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। ভুট্টো আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দলীয় নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করবেন। তিনি ঢাকা ত্যাগের আগে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তৃতা করবেন এবং সেখানে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর আলোচনার ধরন সম্পর্কে আভাস দিবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানের পরামর্শ দিয়েছেন বলে এপিপি পরিবেশিত খবরে প্রকাশ। বঙ্গবন্ধু ভুট্টোর সাথে আজ তৃতীয় ও শেষ দফা বৈঠকের পর সাংবাদিকদের জানান, তিনি ভুট্টোকেও একথা বলেছেন যে, শাসনতন্ত্র প্রণয়ণের জন্য এবং একটি বেসামরিক সরকার গঠন তরান্বিত করার জন্য অবিলম্বে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহূত হওয়া দরকার।

ঘূর্ণি উপদ্রুত এলাকা সফরকালে ভুট্টো সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণদানকালে বলেন, কিছু সংখ্যক লোক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। পিপলস পার্টির নেতা ড. মোবাশির আলী ভুট্টোর সাথে উপদ্রুত এলাকা সফর শেষে ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের পর সাংবাদিকদের কাছে এই তথ্য প্রকাশ করেন। ভুট্টো তাঁর দলের সাতজন সদস্য প্রাদেশিক রিলিফ কমিশনার আসাদুজ্জামান ও জনৈক সামরিক অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে একটি সামরিক বিমানে করে ঘূর্ণি উপদ্রুত এলাকা সফর করেন। পটুয়াখালীতে একটি আইনজীবী প্রতিনিধিদল ভুট্টোর সাথে সাক্ষাৎ করেন।

সিন্ধু জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন ও বেলুচ জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন যৌথভাবে আইনগত কাঠামো আদেশ (এলএফও) বাতিল এবং পাকিস্তানের সকল ফেডারেটিং ইউনিটের পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানান। সিন্ধু জাতীয় ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মেহের হোসেন শাহ এবং বেলুচিস্থান জাতীয় ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি নাসির বালুচ করাচীতে ডাউ মেডিক্যাল কলেজ ক্যান্টিনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই মর্মে যৌথভাবে অভিমত প্রকাশ করেন যে, পাকিস্তান একটি বহু ভাষাভাষী দেশ। তারা সিন্ধী, পাঞ্জাবি পাখতুন ও বেলুচী ভাষাকে জাতীয় ভাষার মর্যাদা দানের দাবি জানান।

চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে বজলুস সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বিরাট জনসভায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বক্তৃতাদানকালে বলেন, "বাংলার জনগণ অবশ্যই স্বাধীন ও সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করবে। এ জন্য বাঙালিরা যে কোন মূল্যদান এমনকি চরম ত্যাগ করতে হলেও পশ্চাদপদ হবে না।" তিনি বলেন, একমাত্র সমাজতন্ত্রই বাংলার মানুষের ভাগো্যান্নয়ন করতে পারে। সমাজতন্ত্র অনুসরণ ছাড়া ফেরেস্তাও যদি ক্ষমতা গ্রহণ করেন তথাপি বাংলার কৃষক ও শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না।
কৃষক শ্রমিক রাজ প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ­ব অপরিহার্য উলে­খ করে তিনি বলেন, এছাড়া সাধারণ মানুষের সর্ববিধ মঙ্গল সাধিত হতে পারে না। এই পর্যায়ে জনসভায় দলীয় কর্মীগণ সে­াগান দেন-'মুক্তির একই পথ বিপ­ব বিপ­ব'। তিনি জয় বাংলা সে­াগানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করার জন্য নব-নির্বাচিত আইন পরিষদ সদস্যদের হুঁশিয়ার করে দেন। জনসভায় তিনি লাহোর প্রস্তাব ব্যাখ্যা করেন এবং গত ২৩ বছর যাবৎ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অবিচারের কাহিনীও বর্ণনা করেন।

30TH JANUARY

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়াম্যান জেড. এ. ভুট্টো সন্ধ্যা ছয়টায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আহুত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেন, তিনি এবং তাঁর পার্টি জাতীয় ঐক্যের আওতার মধ্যে একটি কার্যক্রম ও গ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য একটি স্থায়ী ফর্মূলা বের করতে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালাবেন। তিনি বলেন, তাঁদের এখানে আসার উদ্দেশ্য হচ্ছে মতৈক্যের ক্ষেত্রসমূহ খুঁজে বের করা এবং সাধারণ বিষয়গুলির অনুসন্ধান করা এবং ভ্রাতৃত্ব, সমঝোতা ও সহযোগিতার মনোভাব পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা। বঙ্গবন্ধুর সাথে অনুষ্ঠিত তাঁর বৈঠকের কথা উলে­খ করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা এমন এক জায়গায় এসে ঠেকেছি যা অত্যন্ত কঠিন। আলাপ আলোচনার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভুট্টো সংবাদপত্রসমূহকে নিরপেক্ষতা অবলম্বনের অনুরোধ জানান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভুট্টো এম. এল নাবিক লঞ্চে চড়ে পাঁচ ঘণ্টা নৌ-ভ্রমণ করেন। দুই নেতার উক্ত নৌ-বিহারে শরীক ছিলেন এমন একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায় যে, বঙ্গবন্ধু ও ভুট্টোর ৭০ জনের বিরাট দলসহ নৌযানটি কিছুদূর যাওয়ার পর দুই নেতা একটি আলাদা ছোট্ট লঞ্চে আরোহণ করেন। তাঁরা সেখানে দুইঘণ্টাকাল আলোচনা করেন। তাঁদের মধ্যে এই দীর্ঘ আলোচনা সম্পর্কে দলের অন্যরা যদিও অজ্ঞ তথাপি তাঁদের মতে উভয় নেতা গত তিনদিনের বৈঠকের জের টেনে আলোচনা করেন। নৌ-বিহারে আওয়ামী লীগ দলের সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খন্দকার মোস্তাক, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, মিজানুর রহমান, আবদুল মোমিন, নূরজাহান মোর্শেদ, বদরুন্নেসা আহমদ, সাজেদা চৌধুরী, গাজী গোলাম মোস্তফা, মোস্তফা সারওয়ার ও আওয়ামী লীগ দলীয় এম. এন. এ এবং এমপিএ-গণ ছিলেন বলে এপিপি’র খবরে প্রকাশ। পিপলস পার্টির মধ্যে ছিলেন জে. এ. রহিম, পীরজাদা আবদুল হাফিজ, হানিফ রামে, শেখ রশিদ, রফিক রাজা এবং মেজর জেনারেল থ্যাকার ও অন্যান্য নেতা। পিপলস পার্টি সূত্রে প্রকাশ ড. মোবাশ্বের হাসান এই দলে ছিলেন না, কারণ তিনি গতকাল লাহোরের পথে ঢাকা ত্যাগ করেন।

জননেতা মণি সিং রাজশাহী জেল থেকে এক তারবার্তায় হাবিবুর রহমানের মুক্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করে তাঁকে অভিনন্দন জানান।এখানে উলে­খ্য যে, দেশে দ্বিতীয় দফা সামরিক আইন জারীর পর জননেতা মণি সিং ও হাবিবুর রহমানকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়।

দুইজন তরুণ কাশ্মীর ভারতীয় এয়ার লাইন্সের একটি ফকার ফ্রেন্ডশীপ বিমান অপহরণ করে জোরপূর্বক পাইলটকে বিমানটি লাহোরে অবতরণ করতে বাধ্য করে। অপহরণকারীরা নিজেদের অধিকৃত কাশ্মীরের মুক্তিযোদ্ধাদের সংস্থা জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট এর সদস্য বলে দাবি করে। বিমানে ২৮ জন যাত্রী এবং ৪ জন বৈমানিক ছিলেন। বিমানটি শ্রীনগর থেকে জম্মু যাচ্ছিলো। অপহরণকারীদ্বয় যাত্রীদের মধ্যেই ছিলো। অপহৃত বিমানের বৈমানিকগণ হলেন ক্যাপ্টেন জি. এস. ওবেরিও, ক্যাপ্টেন এম. কে. কাচরু, ফ্লাইটটির পারসার এস. ডি. কৌশিক এবং বিমানবালা কিরণ কোহলী। ট্রানজিট ক্যাম্পে সহকারী পাইলট সাংবাদিকদের সাথে আলোচনাকালে বলেন, জম্মু থেকে মাইল দশেক দূরে যাওয়ার পর অপহরণকারীদের একজন পিস্তল ও হাতবোমা নিয়ে পাইলটকে বিমানটি পাকিস্তানের দিকে ঘুরানোর নির্দেশ দেয়। যাত্রী ও বিমানের নিরাপত্তার খাতিরে পাইলট অপহরণকারীদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

31TH JANUARY

পাঞ্জাব কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি সর্দার শওকত হায়াৎ খান ঢাকায় বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়ার বদৌলতে আওয়ামী লীগ দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে। সবার মতৈক্য হওয়া অবশ্যই ভালো কিন্তু তা বাধ্যতামূলক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। সর্দার শওকত হায়াৎ খান সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সফরে লাহোর থেকে ঢাকা আগমন করেন। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনাকালে তিনি জানান, জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বিরাট সাফল্য অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিনন্দন জানাতে তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করবেন এবং বঙ্গবন্ধু যদি তাঁর সাথে রাজনৈতিক আলোচনা করতে চান তবে, বঙ্গবন্ধুর পছন্দমতো বিষয়গুলি নিয়েই তিনি আলোচনা করবেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ৬ দফাকে অতীতে যদিও "দেশকে খন্ড-বিখন্ড করার ফাঁদ" বলে মনে করা হতো এখন তা সম্পূর্ণরূপে বিবেচনা করার দরকার, কারণ পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ একে সমর্থন করেছে। তিনি বলেন, ৬-দফা বাংলাসহ পাকিস্তানের যে কোন প্রদেশের চেয়ে পাঞ্জাবের বেশি অনুকূলে যাবে।
সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যার ভিত্তিতেই হবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহবানের পক্ষে সুবিধাজনক হবে না। তবে শাসনতন্ত্র গৃহীত হবে বলেই দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেন। ২৩ মার্চের আগেই যদি এটা গৃহীত হয় আমিই সবচাইতে খুশি হবো বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ঢাকার উন্মেষ সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ কর্তৃক পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক সভায় গৃহীত প্রস্তাবে কাগজের মূল্য বৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ ও কাগজের উপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার এবং হ্যান্ডলিং এজেন্ট বাতিলের জোর দাবি জানানো হয়। অপর প্রস্তাবে ঘূর্ণি বিধ্বস্ত চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত রিলিফ প্রদান এবং প্রেস এন্ড পাবলিকেশন অর্ডিনেন্স ও জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থার (বিএনআর) বিলোপ দাবি করা হয়। উন্মেষের সভাপতি জহিরুল ইসলামের সভাপতিত্বে উক্ত সভায় বক্তৃতা করেন পল­ীকবি জসিম উদ্দিন, প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক রণেশ দাশগুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত, আজিজ মিসির প্রমুখ কবি সাহিত্যিক শিল্পী ও চিন্তাবিদগণ। রণেশ দাশ গুপ্ত বলেন, কাগজের মূল্য বৃদ্ধির দরুণ একদিকে শিক্ষাক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে চরম সঙ্কট, অপরদিকে কবি সাহিত্যিক শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের ফেলেছে উৎকণ্ঠার মধ্যে। তিনি বিএনআর-এর বিলোপ দাবি করে এর ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, বিএনআর কে রাখার অর্থই হচ্ছে আইয়ুব মোনায়েমী আমলের অভিশাপ ও স্মৃতি চিহ্নকে আকড়িয়ে রাখা। তিনি একই সঙ্গে প্রেস ট্রাস্টেরও বিলোপ দাবি করেন। উক্ত সভায় সন্তোষ গুপ্ত বক্তৃতাকালে প্রেস এন্ড পাবলিকেশন অর্ডিন্যান্স অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান। পল­ীকবি জসিমউদ্দিন সভায় বক্তৃতাকালে ঘূর্ণি উপদ্রুত এলাকাসমূহে রিলিফ তৎপরতা বৃদ্ধি ও পর্যাপ্ত রিলিফ প্রেরণের দাবি জানান। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ব বাংলার উপর দিয়ে এতো কিছু ঘটে গেল, সকল বিদেশী রাষ্ট্র আমাদের দুঃখে পাশে এনে দাঁড়ালো, অথচ আমাদের দুর্গত মানুষের 'আর্ত আহাজারী' পশ্চিম পাকিস্তানে পৌঁছলো না। সভাশেষে গণসাহিত্য সঙ্গীতের আসর ও জলোচ্ছ্বাসের জারির আসর এবং সবশেষে ১২ নভেম্বর মহাপ্রলয়ের উপর মহসীন শস্ত্রপাণী রচিত 'শবের মিছিলে জীবনের জয়গান' শীর্ষক একটি একাঙ্কিকা মঞ্চস্থ হয়।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক সংক্ষিপ্ত সফরে মুলতান থেকে করাচী পৌঁছেছেন।

প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, আমাদের জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে সমতার ভিত্তিতে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে নয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলেই কেবলমাত্র পাকিস্তান একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে টিকে থাকতে পারে। একে মূলভিত্তি করে শেখ মুজিবুর রহমান ও ভুট্টোর শাসনতান্ত্রিক কাঠামো রচনা করা উচিত। সরকারের সদর দফতরের বেলাও এর ব্যতিক্রম করা চলবে না। তিনি বলেন, রাষ্ট্রকাঠামোই যেহেতু সনাতনী নয় সেহেতু সরকার সনাতনী হওয়ার কোন অবকাশ নেই। দ্বৈত কেন্দ্রই কেবলমাত্র একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র কাঠামোর সুনিশ্চয়তা বিধান করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এর ফলে দুই অংশের জনগণ তাদের নিজ ভূমিতে বসে সমভাবে তাদের সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করতে পারে। তিনি বলেন, ‘‘বিশেষ করে ভুট্টোর প্রতি আমার আবেদন, দেশের শোষণকারী অংশের প্রতিনিধিত্ব তাঁকে করতে হচ্ছে। সেই অংশের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ যা এ যাবৎ উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন তাঁকে তা অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে।"

চারদিনব্যাপী সফর শেষে ভুট্টো লাহোরের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে তেজগাঁও বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনাকালে তিনি বলেন, জাতীয় রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে একটি স্থায়ী শাসনকার্য পদ্ধতি প্রণয়নের সাধারণ লক্ষ্য অর্জনে শাসনতান্ত্রিক প্রশ্নে সমঝোতা ও মতৈক্য খুঁজে বের করতে আমরা চেষ্টা চালাবো। আমরা যদি সহযোগিতা ও সমঝোতার দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখি, তাহলে আমাদের জাতীয় রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে একটি স্থায়ী শাসনকার্য পদ্ধাতি বের করার ব্যাপারে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও দুই নেতার মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে কী না প্রশ্ন করা হলে ভুট্টো বলেন, "প্রকৃতপক্ষে আমি কখনই কোন ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তাব করিনি। আমি শুধু বলেছি যদি আমাদের তিনজনের মতৈক্য হয় তাহলে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য ১২০ দিনও লাগবে বলে আমি মনে করি না।"
বিমানবন্দরে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ এইচ এম কামরুজ্জামান এবং তাজউদ্দিন আহমদসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ভুট্টোকে বিদায় জানান।